মৌলভীবাজারে ‘নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পে’ সদর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর নয়ছয়
-
শ. ই. সরকার (জবলু) ষ্টাফ রিপোর্টার মৌলভীবাজার - আপডেট সময় ০৮:২১:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ইউপি মেম্বারের কর্মচারী, ইউপি মেম্বারের বাবা, বাড়ী-গাড়ীর মালিক, স্বজনরা যুক্তরাজ্য প্রবাসী, শহরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মার্কেট ভবনের মালিক- এমন লোকজন রয়েছেন “নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প ২০২৪-২০২৫” এর আওতায় সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপ বরাদ্দ প্রাপ্তদের তালিকায়। পক্ষান্তরে, প্রাপ্যতাযোগ্য অনেককেই করা হয়েছে বঞ্চিত। এভাবেই “নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প ২০২৪-২০২৫” বাস্তবায়ণে অনিয়ম-দূর্ণীতি করার অভিযোগ মৌলভীবাজার সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। জানা গেছে- নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প ২০২৪-২০২৫ এর আওতায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রতিটি ইউনিয়নে ১২টি করে মোট ১৪৪টি সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপ স্থাপন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইউনিয়ন ভিত্তিক স্থান ও লোক নির্বাচন করা হয়েছে অনিয়ম-দূর্ণীতির মাধ্যমে। ৬নং একাটুনা ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১নং ওয়ার্ডে পরিচালিত অনুসন্ধানে দেখা যায়- ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দকৃত ১২টি সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপের মধ্যে ৫টিই অনিয়ম-দূর্ণীতির মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১নং ওয়ার্ডে। একইভাবে ৮নং কনকপুর ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪নং ওয়ার্ডে পরিচালিত অনুসন্ধানে দেখা যায়- ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দকৃত ১২টি সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপের মধ্যে ১টি অনিয়ম-দূর্ণীতির মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪নং ওয়ার্ডে। নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প ২০২৪-২০২৫ এর আওতায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রতিটি ইউনিয়নে ১২টি করে মোট ১৪৪টি সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপ বরাদ্দতালিকার ৬৩নং মোঃ হারুন মিয়া ৬নং একাটুনা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের নাগরিক। তার এক ছেলে শাহাদ আহমেদ ৬নং একাটুনা ইউপি’র ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার। আরেক ছেলে আহাদ আহমদ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব। সপরিবারে এক ছেলে ও এক মেয়েসহ দুই ভাইয়ের পরিবারের অনেক সদস্য যুক্তরাজ্য প্রবাসী। প্রামে বিশাল বাড়ীসহ অনেক সহায় সম্পদও রয়েছে। বরাদ্দতালিকার ৬৪নং রুহেল আহমেদ ৬নং একাটুনা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের নাগরিক ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক কমিটির সদস্য। শহরের চাঁদনীঘাটে তার রয়েছে তৈয়ব ম্যানসন নামে মার্কেট, গ্রামে রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ী ও কয়েকটি কলোনি। তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রবাসী। বরাদ্দতালিকার ৬৬নং লিটন মিয়া ৬নং একাটুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুনা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের নাগরিক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য। তিনি জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য মুহিতুর রহমান হেলালের ভাতিজা। তার রয়েছে গাড়ির ব্যবসা ও কয়েকটি সিএনজি অটোরিকশা। তার ছোটভাই স্বপরিবারে যুক্তরাজ্য প্রবাসী এবং বড়ভাই ব্যবসায়ী ও সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিকনেতা (চৌমোহানা টু একাটুনা শ্রমিক পরিচালনা কমিটির সভাপতি)। বরাদ্দতালিকার ৬৭নং ইব্রাহিম মিয়া ও ৬৮নং মোঃ খসরু জামান অন্য ইউনিয়নের নাগরিক এবং কর্মসূত্রে ৬নং একাটুনা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডে বসবাসরত। তারা ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার ও জাতীয়তাবাদী যুবদলের একাটুনা ইউনিয়ন সভাপতি জামাল আহমদের দোকান এবং বাড়িতে কর্মরত। তা সত্তেও তাদের নামেও সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বরাদ্দতালিকার ৮৯নং দামিয়া শাহী ঈদগাহ ৮নং কনকপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের দামিয়া গ্রামে অবস্থিত। দামিয়া শাহী ঈদগাহের আশপাশের প্রায় সব বাড়ীতেই নিজস্ব নলকূপ, কারও কারও সাধারণ পাম্পসহ নলকূপ এবং কারও কারও সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপ রয়েছে। কারও কারও নিজস্ব পুকুরও রয়েছে। ঈদগাহে স্থাপিত সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপ থেকে পানি নেয়ার কারও প্রয়োজন নেই এবং কেউ এখান থেকে পানি নেয়ও না। আর, ঈদগাহে বছরে দুইবার ঈদের জামাত এবং কদাচিৎ ওয়াজ মাহফিল ব্যতিত সারাবছর আর কখনও লোকসমাগমও হয় না। এককথায়- দামিয়া শাহী ঈদগাহে সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপ স্থাপনের কোনই গুরুতর প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নেই। এ প্রতিবেদনে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প ২০২৪-২০২৫ এর সুবিধাভোগীদেরকে খাটো করার উদ্দেশ্যে নয়, শুধুমাত্র সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মোঃ মহিউদ্দিনের অনিয়ম-দূর্ণীতির প্রমান হিসাবে নামগুলো উল্লেখ করতে হয়েছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে থাকা ১০৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ২টি ইউনিয়নের ২টি ওয়ার্ডে অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে অনিয়ম-দূর্ণীতির উপরোক্ত চিত্র। তাহলে বাকী ১০টি ইউনিয়নের অন্ততঃ ১০টি ওয়ার্ডে অনুসন্ধান করলে কেমন চিত্র উঠে আাসবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিচয় গোপন রাখার নিশ্চয়তায় একাধিক সূত্র দাবী করেছে- সুষ্ঠু তদন্ত করা হলে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প ২০২৪-২০২৫ বাস্তবায়নে সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মোঃ মহিউদ্দিনের অনিয়ম-দূর্ণীতির ব্যাপক প্রমান পাওয়া যাবে। নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প ২০২৪-২০২৫ বাস্তবায়নের জন্য যে বা যারা তালিকা দিয়েছেন এবং যে বা যারা চুড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন ও সহযোগীতা করেছেন, তারাসহ মৌলভীবাজার সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মোঃ মহিউদ্দিন এবং আরও ২ জন কর্মকর্তা/কর্মচারী এহেন অনিয়ম-দূর্ণীতিতে জড়িত বলেও জানিয়েছে ওই একাধিক সূত্র। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প ২০২৪-২০২৫ বাস্তবায়নে অনিয়ম দূর্ণীতির প্রমান চোখে পড়ার পর এ প্রতিনিধি নিজেই এ বিষয়ে এবং মনুনদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের জন্য অধিগ্রহণকৃত ভূমির মূল্য নির্ধারণে অনিয়ম-দূর্ণীতির বিষয়ে দুদকের র্নিধারিত ফরমে দুদকের গণশুনানী অনুষ্ঠানে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। দুদকের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক উক্ত অভিযোগদু’টি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু, কোন অভিযোগের বিষয়েই কোন ব্যবস্থা গ্রহন পরিলক্ষিত হয়নি অদ্যাবধি। এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য মৌলভীবাজার সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মোঃ মহিউদ্দিনের সাথে মোবাইল ফোনে তিনদিন যোগাযোগের পর স্বশরীরে তার মুখোমুখী হলে তিনি বলেন- তালিকা দেন ইউপি চেয়ারম্যানরা এবং অনুমোদন দেন ইউএনও স্যার। এতে আমার বা আমার অফিসের কোন ভূমিকা নেই। এরপর কয়েকটি প্রশ্ন করলে তিনি বলেন- আমি এখন সময় দিতে পারছি না। ফ্রী হয়ে আপনাকে ফোন করবো। তখন এসে বক্তব্য নিয়েন। এর তিনদিন পর পর দুইদিন মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে প্রতিবারই তিনি ফোন কল কেটে দেন। এরপর তিনসপ্তাহ অপেক্ষা করলেও তিনি আর ফোন করেননি। তার এ আচরণ থেকে ধারণা করা যায়- নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প ২০২৪-২০২৫ এর আওতায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ১৪৪টি সাবমার্সিবল পাম্পসহ গভীর নলকূপ স্থাপন কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনিয়ম দূর্ণীতির অভিযোগ খন্ডন করা সম্ভব নয় বলেই তিনি এ প্রতিবেদকের মুখোমুখী হননি।
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
