ঠাকুরগাঁওয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের জনসভা ও গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ঠাকুরগাঁওয়ে বিগত দিনে বিএনপি যে উন্নয়ন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে, আগামী নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বিজয়ী হলে সেই উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে এমপি ও মন্ত্রী হয়ে সর্বশেষ যিনি দেশের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়েছেন, তিনি ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আনলেও স্থানীয় জনগণ সেই টাকার কোনো সুফল পাননি। উন্নয়ন বরাদ্দের একটি বড় অংশই সাধারণ মানুষের কল্যাণ বা এলাকার অবকাঠামোগত অগ্রগতিতে কাজে আসেনি। আবার রাষ্ট্রপতি নিজেই দেলাওয়ার হোসেনের ব্যাপারে মন্তব্য করেছিলেন—দেলাওয়ার ভালো ছেলে, সৎ ছেলে। তিনি বলেন, এমপি বিরোধীদলীয় না সরকারদলীয়—সেটা মুখ্য বিষয় নয়।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন উপলক্ষে শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সমর্থনে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের বিপুল জনগণকে আর কোনো একক পরিবারের কাছে বন্দি রাখা যাবে না। যে পরিবার বারবার এই অঞ্চলের মানুষকে শোষণ করেছে, তাদের হাত থেকে চূড়ান্ত মুক্তির লক্ষ্যে আগামী ২৯ অক্টোবর দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে জনগণের নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করতে তিনি স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ ও প্রিসাইডিং অফিসার ঘেরাওয়ের হুশিয়ারি
মাগুরা মার্কা প্রহসনের নির্বাচনের চেষ্টা চালানো হলে বিএনপিকে আবারও গদি হারিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হবে বলে হুঁশিয়ার করে দেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঠাকুরগাঁওবাসী আজ ঐক্যবদ্ধ এবং তারা সবাই দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের বিজয়ের জন্য ব্যাকুলভাবে অপেক্ষা করছেন। নিজেদের নিশ্চিত পরাজয় আঁচ করতে পেরে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের মতোই এখানেও নানা ধরনের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের সর্বস্তরের জনসাধারণের উদ্দেশে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যে ভোটকেন্দ্রে জনগণের পবিত্র আমানত ও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সামান্যতম কারচুপির চেষ্টা করা হবে, সেই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হবে এবং ভোটের সঠিক হিসাব বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র ছেড়ে কেউ এক পা-ও নড়বেন না। প্রতিটি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা হবে। সন্ত্রাস-চাঁদাবাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে ব্যবসায়ীদের এক পয়সাও চাঁদা দিতে হবে না। বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায়, কীভাবে ব্যয় হয়েছে, সেই হিসাবও জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ একটি মামলাও করেছে কি না, প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, বরং তিনি নিজেও মামলা বাণিজ্য করেছেন বলে জনগণের মুখে শোনা যায়।
অপপ্রচারের জবাব ও বিএনপির অতীত ইতিহাস
ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির বিভিন্ন নির্বাচনী সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে দলটির নেতাদের রাজনৈতিক অপপ্রচারের তীব্র সমালোচনা করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনো কোনো ধরনের মানবতাবিরোধী কাজের সাথে যুক্ত ছিল না। তাই বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও দোষ ঢাকতে জামায়াতে ইসলামীর নামে নানা রকম মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী যে, জামায়াতকে নিয়ে মিথ্যাচার করা হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ব্যক্তিবর্গকে বিএনপি একসময় এমপি, মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মতো শীর্ষ রাষ্ট্রীয় পদে বসিয়েছিল। তিনি মনে করিয়ে দেন, বিএনপির অনেক দায়িত্বশীল নেতার অতীত কর্মকাণ্ড ও ইতিহাস দেশবাসীর কাছে অজানা নয়। বরং বিএনপি নেতাদের অনেকের আব্বা, ভাই রাজাকার ছিলেন এবং তারাই মানবতাবিরোধী কাজ করেছেন। কিন্তু তাদের নিয়ে অতীতের কোনো এমপি-মন্ত্রীর পরিকল্পনা ছিল না। আগের মতোই ঘুষ, চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হচ্ছে।
জননিরাপত্তা, যুবদের কর্মসংস্থান ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট
জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মনোনীত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘ ৫৫ বছরে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে একাধিক ব্যক্তি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তারা বারবার বিজয়ী হয়ে কেবল নিজেদের ভাগ্য ও ব্যক্তিস্বার্থের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, সাধারণ জনগণের ভাগ্যের কোনো বাস্তব উন্নয়ন ঘটাননি। চিকিৎসাসেবার বেহাল দশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো উন্নত বা আধুনিক সরকারি হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়নি। যদি ঠাকুরগাঁওয়ে উন্নত মানের সরকারি হাসপাতাল থাকত, তবে এলাকার মানুষকে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য রংপুরে বা দিনাজপুরে গিয়ে ভিটেমাটি ও সর্বস্বান্ত হতে হতো না, আর সঠিক চিকিৎসার অভাবে কাউকে অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হতো না। রুহিয়া ও ভুল্লী উপজেলায় পৃথক পৃথক মা ও শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। তিনি আরও বলেন, যে দলের নেতারা হাসপাতাল ভেঙে জমি দখল নেন, যে দলের নেতারা কৃষকের সার লুট করে পাচার করেন, যে দল জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে সেই প্রতিশ্রুতি কেবল ভোট পাওয়ার জন্য ছিল বলে সংসদে স্বীকার করে, সেই দলকে ক।
শিক্ষিত বেকার সমস্যা ও আধুনিক হাসপাতাল গড়ার অঙ্গীকার
দেলাওয়ার হোসেন আরও বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের উদীয়মান যুবসমাজের স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অতীতকালের এমপি-মন্ত্রীরা কোনো বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। ফলে এখানে বর্তমানে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ রয়েছেন, যারা সরকারি বা বেসরকারি পর্যায় থেকে সামান্য নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা পেলেই নিজেদের যোগ্যতায় স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেন। আগামী দিনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক জয়ী হলে ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। একই সাথে রাষ্ট্রপতির অতীত মাদকবিরোধী প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার গঠনের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও ঠাকুরগাঁও থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব হয়নি, কারণ মাদকসেবীদের দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ কখনোই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে তাদের কোনো অপপ্রচারই দেশবাসী গ্রহণ করেনি, করবে না। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সব পদে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কারা হিন্দুদের মামলার ভয় দেখিয়ে ঘরবাড়ি ছাড়া করেছে, কারা মামলা থেকে নাম কাটার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাদের চিনে রাখুন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির এই দুটি কথা মূল্যায়ন না করে আবেগে কিংবা কারও মিষ্টি কথায় প্রভাবিত হয়ে ভোট দিলে জনগণ নিজেদের এমপির দ্বারাই জুলুমের শিকার হবেন। কারণ, এমপিদের জন্য বরাদ্দ সব এমপির জন্য সমান।
ভোটাধিকার রক্ষা ও জনগণের ঐক্যের আহ্বান
জনসভা থেকে ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ ও অন্যান্য ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারাও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো রূপ অনিয়ম হলে কড়া জবাব দেওয়ার হুশিয়ারি দেন। তারা বলেন, জনগণের ভোটের ফলাফল পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে প্রিসাইডিং অফিসার বা নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো বিশেষ পক্ষকে সুবিধা দিলে পালানোর পথও তারা খুঁজে পাবেন না। ভোটাররা কেন্দ্র পাহারা দিয়ে তাদের অধিকার রক্ষা করবেন। আগামী ২৯ অক্টোবর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে দেশপ্রেমিক ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের সর্বস্তরের ধর্ম, বর্ণ ও দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে বিশাল উপস্থিতি
ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক বেলাল উদ্দীন প্রধানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশাল জনসভাটি পরিচালনা করেন জেলা সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলমগীর। জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক আমির মাওলানা আব্দুল হাকিম, দিনাজপুর জেলার সাবেক আমির আনোয়ারুল ইসলামসহ ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেন। সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি ও ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে পুরো সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
- ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা মার্কার পক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যের বিশাল নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত।
- বিএনপির অপপ্রচারের জবাবে ব্যালটের মাধ্যমে সঠিক রায় দেওয়ার আহ্বান জানান সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
- উন্নত সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র না থাকায় জেলাবাসীর ভোগান্তি ও সর্বস্বান্ত হওয়ার চিত্র তুলে ধরেন প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন।
- শিক্ষিত বেকারদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপনের জোরালো অঙ্গীকার।
- ভোট কারচুপি রোধে কেন্দ্র পাহারা দেওয়া ও প্রিসাইডিং অফিসারদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার হুঁশিয়ারি।
The post ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির প্রতারণার জবাব ব্যালটে দেওয়ার আহ্বান গোলাম পরওয়ারের appeared first on Daily Sangbad Chorcha.
