যারা ট্রেনের যাত্রী তারা বেশিরভাগ সময়ই অনলাইনে টিকিট কাটতে গেলে বিভ্রান্তিতে পড়েন। দেখা যায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। যা মাত্র কয়েক মিনিট মানে টিকিট ছাড়ার এক দু’ঘণ্টার ভিতরেই সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। ফলে অনেকেই ভোগান্তিতে পড়েন এবং রেলকে পরিত্যাগ করে বাসের টিকিট কেনেন। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা টিকিট বিক্রি নয় সবধরনের টিকিট ব্লক করে দেওয়া হয়।
যদিও টিকিটের চাহিদা থাকার পরেও প্রতিবছর ট্রেন তথা রেলকে লোকসান গুণতে হচ্ছে। এদিকে এই ঘটনার পিছনের বিশাল চক্র তথা কারিগরদের একটি তথ্য সম্প্রতি সামনে এসেছে। তাদের অপকর্মের ফিরিস্তি সামনে আসার পর সাধারণ মানুষের চোখ কপালে উঠেছে। একটি অডিট থেকে এমন কান্ডের থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে সহজ’র প্রতিনিধি ও বুকিং সহকারীদের যোগসাজশে টিকিট কালোবাজারির সুযোগ রয়েছে।
অডিটের তথ্য বলছে, বিআরআইটিএসের অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে সাধারণ যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত টিকিট অনলাইনে ছাড়ার কয়েক দিন আগেই ব্লক করে রাখার সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট স্টেশনে বিষয়টি পরীক্ষা করে অডিট দল। চট্টগ্রাম স্টেশনের অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ডে চলতি বছরের ২৭ জুলাই কক্সবাজার-ঢাকা রুটের পর্যটক এক্সপ্রেসের ১১ আগস্টের একটি আসন কোটায় ব্লক দেখানো হয়। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ১১ আগস্টের টিকিট সাধারণ যাত্রীদের জন্য ১ আগস্ট সকাল ৮টায় অনলাইনে ছাড়ার কথা। ট্রেনের সাধারণ যাত্রীদের জন্য অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কয়েক দিন আগেই অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার সুযোগ রয়েছে।
অডিটে ‘সহজ’ কর্মীদের পরিচালনায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের তথ্য রয়েছে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিআরআইটিএস-এর কার্যক্রম নিয়ে করা এই অডিটে গুরুতর আরো অনিয়ম ধরা পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে সমন্বিত টিকিটিং ব্যবস্থায় (বিআরআইটিএস) মূল ডেটাবেইস আমাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) সিঙ্গাপুর অঞ্চলে ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউডে থাকায় তা হ্যাক হলে যাত্রীদের নাম, মোবাইল ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, ই-মেইল, ভ্রমণ ইতিহাস ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চুরি ও প্রতারণার ঝুঁকি রয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে অনলাইন টিকিট বিক্রির আয়ের চেয়ে কম টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া, সিস্টেম দীর্ঘসময় অকার্যকর থাকায় সহজ লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় না করার তথ্য রয়েছে। পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে পাঠানো চিঠিতে আইটি অডিট দলের ইস্যু করা ২২টি অডিট মেমো গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, তারা অডিট প্রতিবেদন পেয়েছেন এবং অডিটের বিষয়গুলো তাদের নজরে এসেছে। অডিট প্রতিবেদন তারা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছেন।
তবে অডিটের মতে, এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ ঘাটতির কারণে ভেন্ডর প্রতিনিধি ও বুকিং সহকারীদের যোগসাজশে যেকোনো রুটের ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির সুযোগ রয়েছে। অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ডে এসব কার্যক্রমের অ্যাকটিভিটি লগ বা অডিট লগ দেখার সুযোগ না থাকায় অনিয়ম শনাক্ত বা প্রতিরোধ করাও কঠিন। এ বিষয়ে রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়মানুযায়ী যাত্রার ১০ দিন আগে সকাল ৮টায় অনলাইন ও কাউন্টারে টিকিট বিক্রি শুরু হয়। তবে সিস্টেমে এরও পাঁচ দিন আগের টিকিটের তথ্য প্রস্তুত রাখা হয়।
আগে ভাগে এই তথ্য রাখার উদ্দেশ্য টিকিট বিক্রি করা নয়। বরং টিকিট বিক্রি শুরুর আগে ট্রেনের সময়সূচি, স্টেশন, আসনবিন্যাস ও কোটা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তা সংশোধন করা। তিনি বলেন, টিকিট বিক্রি শুরুর দিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত কোনো ব্যবহারকারী আসন বা কোটা স্থানান্তর করতে পারেন না। এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে টিকিট বিক্রির কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে, যাত্রীদের জন্য টিকিট আটকে রাখতে নয়।
শামিম রানা শামু নামের এক যাত্রী ১০ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, সকাল ৮টায় টিকিট বিক্রি শুরুর কথা থাকলেও ৭টা ৫৯ মিনিটেই ৩৫ জনকে টিকিট বুকিং দিতে দেখা যায়। তখন অনলাইনে অপেক্ষায় ছিলেন ৫২৪ জন সক্রিয় ব্যবহারকারী। তার সন্দেহ, বুকিং দেওয়া অ্যাকাউন্টগুলো অ্যাডমিনের হতে পারে। সকাল ৮টা ১ মিনিটের মধ্যেই ওই ট্রেনের সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। অথচ সাধারণ যাত্রীর টিকিট কেটে বিকাশে মূল্য পরিশোধ করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট লাগে।
চুক্তি অনুযায়ী, সহজের কর্মীদের শুধু সিস্টেমের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকার কথা। টিকিট বিক্রি, কোটা সমন্বয় বা আসন ব্লক-রিলিজের মতো কার্যক্রমে তাদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। তবে অডিটে সহজের কর্মীদের পরিচালনায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অ্যাকাউন্ট দিয়ে কোটা সমন্বয়, আসন ব্লক-রিলিজ, কাউন্টার তৈরি ও টিকিট হস্তান্তরের মতো কাজ করা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, এ ধরনের প্রতিটি ঘটনায় ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও বিআরআইটিএস চালুর পর প্রায় ১৬৩টি স্টেশনে ভেন্ডরের কর্মীদের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম চললেও রেল কর্তৃপক্ষ কোনো জরিমানা করেনি বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিটে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৪ মাসে ১৬৩টি স্টেশনের মধ্যে ১০টি স্টেশনের হিসাব পর্যালোচনা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যালোচনায় অনলাইন টিকিট বিক্রির আয় থেকে সরকারি কোষাগারে ৮ কোটি ৫ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ টাকা কম জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কমলাপুরে ৪ কোটি ৭৫ লাখ, চট্টগ্রামে ১ কোটি ৩ লাখ এবং রাজশাহীতে ৯৬ লাখ টাকার বেশি ঘাটতি রয়েছে। একই সময়ে ভ্যাট বাবদ ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৯০২ টাকা কম জমা পড়ে। সব স্টেশনের হিসাব পূর্ণাঙ্গভাবে নিরীক্ষা করা হলে আরো অনিয়ম ধরা পড়তে পারে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রযুক্তি পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু যাত্রীদের তথ্য, টিকিটের নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক প্রবেশাধিকার এবং রাজস্বের জবাবদিহি কোনোভাবেই ভেন্ডরের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। রেলওয়ের নিজস্ব দক্ষ আইটি বিভাগ, সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা এবং স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এখন জরুরি। রেলওয়ের ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর জন্য ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি করে রেলওয়ে। ওই বছরের ২৬ মার্চ থেকে প্রতিষ্ঠানটি টিকিট বিক্রির দায়িত্ব নেয়। চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা।
বিআলো/অর্নব