মানারাত ক্লাবস ফর কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের (এমসিসিএ) অধীনে আয়োজিত রাজধানীর প্রায় ৮৭ টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আট শতাধিক প্রতিযোগী অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে 'MDIC STEM FEST 2026-27'। যেখানে খুদে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত রোবটের ফুটবল খেলা থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয় রোবটিক্স গাড়ির মতো সব প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী প্রকল্পে মুখর হয়ে উঠেছে রাজধানীর মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (এমডিআইসি) ক্যাম্পাস।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীল চিন্তা, উদ্ভাবনী দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বিকাশের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী এই আয়োজন।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের তৈরি রোবট ও প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রকল্প। নিজেদের উদ্ভাবন অতিথিদের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যপ্রণালি ব্যাখ্যা করে শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীদের প্রকল্প ঘুরে দেখেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব ও মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব উল আলম। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা ও প্রযুক্তির ব্যবহার দেখে তারা প্রশংসা করেন এবং বৃহত্তর পরিসরে অর্জনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এ-লেভেল দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তাহিয়াদ ইসলাম তৈরি করেছে ‘রোবো সকার’ নামের একটি রোবট। ফুটবল খেলার উপযোগী করে তৈরি এ রোবটের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় দুটি রোবটকে একে অপরের বিপক্ষে খেলানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। প্রযুক্তির সঙ্গে খেলাধুলার সমন্বয় ঘটিয়ে নিজের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে এই শিক্ষার্থী।
নিজের উদ্ভাবন সম্পর্কে তাহিয়াদ ইসলাম বলে, ‘আমি মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এ-লেভেল সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। রোবট বানাতে আমার ভালো লাগে। এই রোবটটি তৈরি করতে আমার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ভবিষ্যতে এটিকে আরও সুন্দর ও উন্নত করতে চাই।’
তাহিয়াদের মতো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনে আগ্রহী এ-লেভেল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাহদী হাসান। সে তৈরি করেছে ‘লাইন ফলোয়িং রোবট’। ছোট গাড়ির মতো দেখতে রোবটটি নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম। এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় চলাচল ও প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার একটি বাস্তব প্রয়োগ তুলে ধরেছে সে।
নিজের প্রকল্প সম্পর্কে মাহদী হাসান বলে, ‘আমি মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এ-লেভেল ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। এই রোবট তৈরি করতে প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়েছে।’
শুধু রোবোটিকস নয়, উৎসবে গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে মাইনক্রাফটভিত্তিক কার্যক্রম, উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শনী ও ট্রেজার হান্ট। এসব আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যুক্তিনির্ভর চিন্তা, বিশ্লেষণী দক্ষতা, দলগত কাজ এবং নতুন ধারণা উদ্ভাবনের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উৎসবের প্রথম দিন সকাল ৯টায় তৃতীয় শ্রেণি থেকে এ-২ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের গণিত অলিম্পিয়াডের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড এবং সপ্তম থেকে এ-২ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জীববিজ্ঞান ও রসায়ন অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয় রোবোটিকস ও মাইনক্রাফটভিত্তিক কার্যক্রম। বেলা আড়াইটা থেকে ট্রেজার হান্ট এবং বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সপ্তম শ্রেণি থেকে এ-২ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের আয়োজন রাখা হয়।
স্টেম ফেস্টের আহ্বায়ক ও মানারাত সায়েন্স ক্লাবের ইনচার্জ ড. মো. মাকসুদুল আলম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম। STEM Fest-এর প্রতিটি আয়োজন শিক্ষার্থীদের শেখার আনন্দ, সৃজনশীলতা, সহযোগিতা ও বাস্তবমুখী চিন্তার সুযোগ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা শুধু প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জনই নয়, বরং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া, নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করা এবং নিজেদের জ্ঞানকে মানবকল্যাণে প্রয়োগ করার মানসিকতা অর্জন করুক।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ওপর মানবসভ্যতার সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, আবিষ্কার ও গবেষণার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আজ যারা নিজেদের প্রকল্প ও উদ্ভাবন প্রদর্শন করছে, তারাই আগামী দিনে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে উপাচার্য বলেন, বৈজ্ঞানিক সাফল্য মানুষের জীবনকে সহজ ও সমৃদ্ধ করলেও নৈতিক মূল্যবোধের অভাবে সেই অর্জন মানুষের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না। তাই জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মানবকল্যাণে সেই জ্ঞান প্রয়োগের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব উল আলম বলেন, এবারের স্টেম ফেস্টে রাজধানীর প্রায় ৮৭ থেকে ৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আট শতাধিক প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছে। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতায় সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের গবেষণা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি এবং প্রার্থনা করি যে একদিন মানারাত থেকে একজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পাবেন। আসুন আমরা তার জন্য প্রার্থনা করি এবং তার জন্য স্বপ্ন দেখি। আর এর জন্য আমাদের এখন থেকেই শুরু করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত সংযুক্ত ও পারস্পরিক নির্ভরশীল। তাই শুধু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করলেই চলবে না, নতুন উদ্ভাবনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতাও থাকতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের পাশাপাশি সেগুলোর যথাযথ বিপণন, শৃঙ্খলা এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, উত্তরার অধ্যক্ষ ড. মো. মোশারফ হোসেন, মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, গুলশানের উপাধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল করীম ও অধ্যাপক তাহমীনা ইয়াসমীন, বালক শাখার সমন্বয়ক মহসিন কোরায়শী এবং স্টেম ফেস্টের বালিকা শাখার আহ্বায়ক রোকসানা খানমসহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
