এক দশকে কমেছে হরিণের সংখ্যা, হরিণঘাটা বনসংলগ্ন এলাকার মৎস্যজীবী বাদল দফাদার জানান, ২০১৫ সালে তিনি ট্রলার নিয়ে সাগরে মাছ শিকারে যাওয়ার সময় ছোট হোর ও বড় হোর নামে দুটি খালের পাশে হাজার হাজার হরিণ দেখতে পেতেন। বর্তমানে সেখানে আগের মতো হরিণের পাল দেখা যায় না। মাঝেমধ্যে দু-চারটি হরিণের ডাক শোনা যায়। বাদল দফাদারের দাবি, ২০১৫ সালে প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বনে ১০ থেকে ১৫ হাজার হরিণ ছিল। বর্তমানে তা কমে আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে এ সংখ্যার পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক জরিপের তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, অসাধু শিকারিরা নিয়মিত ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করায় বনে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বন বিভাগ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে হরিণের নিরাপত্তা ও আবাসস্থল নিশ্চিত করতে পারলে আগামী দুই বছরে হরিণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
হরিণঘাটা বন রক্ষায় কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার জন্য বন বিভাগের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বন দখল ও শিকারে হারাচ্ছে ঐতিহ্য, হরিণঘাটা বনের একাংশ চরলাঠিমারা এলাকার বাসিন্দা বারেক মিয়া বলেন, একসময় হরিণের পাল ছিল পাথরঘাটা এলাকার অন্যতম আকর্ষণ। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা হরিণ দেখতে এখানে আসতেন। কিন্তু এখন বনের মধ্যে হরিণের পরিবর্তে গরু-মহিষের পাল বেশি চোখে পড়ে।
তাঁর অভিযোগ, কিছু ভূমিদস্যু বনের গাছপালা কেটে জমি দখল করায় বনাঞ্চলের আয়তন কমেছে। এতে হরিণের নিরাপদ আশ্রয় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শিকারিদের জন্যও হরিণ শিকার সহজ হয়েছে। বন বিভাগের যথাযথ নজরদারির অভাবেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙনে সংকুচিত আবাসস্থল, পাথরঘাটা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সোহাগ হোসেন জানান, সুন্দরবনের পর দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল পাথরঘাটার হরিণঘাটা বন। ১৯৩৮ সালে প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ বন গড়ে ওঠে। সুন্দরবন থেকে নদীপথে সাঁতরে এসে শত শত হরিণ এখানে আশ্রয় নিয়েছিল বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, শ্বাসমূলীয় গাছের গোড়ায় বালি জমা, মাটির ক্ষয় এবং নদীভাঙনের কারণে উপকূলীয় বনাঞ্চলের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ মারা যাচ্ছে এবং হরিণের বিচরণক্ষেত্র ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। ফলে মাঝে মাঝে হরিণ লোকালয়ে চলে আসে। এ সময় কুকুরের আক্রমণেও কিছু হরিণ মারা যায়।
রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে শিকারিদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বন বিভাগ হরিণ শিকার বন্ধে কাজ করছে এবং শিকারিদের তৎপরতা প্রতিরোধের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনে বনের আয়তন কমে যাওয়ায় হরিণের আবাসস্থল ক্রমে অনুপযোগী হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন চরাঞ্চলে শ্বাসমূলীয় গাছ রোপণ করা হচ্ছে। এসব গাছ টিকে থাকলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
হরিণ রক্ষায় জনবল ও কার্যকর সংরক্ষণ জরুরি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়াইল্ড টিমের প্রাণী সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ মো. আলম হাওলাদার বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষ, প্রাণী ও বৃক্ষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়েই পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে। তাই বন্যপ্রাণীর খাদ্য, নিরাপদ আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের অসচেতনতা এবং বনাঞ্চলে গাছপালা ধ্বংসের কারণে সুন্দরবন ও এর আশপাশের বনগুলো ক্রমেই বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে। নিরাপদ আবাসস্থল হারিয়ে বন্যপ্রাণী অরক্ষিত হয়ে উঠছে। পাথরঘাটা ও আশপাশের এলাকায় হরিণ শিকারি চক্রের তৎপরতার অভিযোগও উদ্বেগজনক। এসব কারণে বনাঞ্চলের পরিবেশ ও প্রাণিকুলের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
আলম হাওলাদার আরও বলেন, হরিণসহ বন্যপ্রাণী রক্ষায় অভয়ারণ্য গড়ে তোলা, শিকার বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের পাশাপাশি বনকর্মীদের কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অস্তিত্ব রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের দাবি,স্থানীয় বাসিন্দা, বন বিভাগ ও প্রাণী সংরক্ষণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে হরিণঘাটা বনের হরিণের অস্তিত্ব রক্ষায় কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—অবৈধ শিকার বন্ধ, বন দখল ও গাছপালা ধ্বংস প্রতিরোধ, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং হরিণের নিরাপদ আবাসস্থল পুনরুদ্ধার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত বন্যপ্রাণী গণনা ও বৈজ্ঞানিক জরিপের মাধ্যমে হরিণের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বন বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং শিকারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হরিণঘাটা বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার পথ সুগম হতে পারে। একসময় যে হরিণের পাল পাথরঘাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পরিচয় বহন করত, সেই বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
The post পাথরঘাটা হরিণঘাটা বনের হরিণ এখন বিলুপ্তির পথে appeared first on ভোরের চেতনা.
