সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও হামলা হয়েছে। শনিবারের প্রাণঘাতী হামলার পর গতকাল রবিবার বিমানবন্দরটির চার নম্বর টার্মিনালে নতুন করে একটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এতে সেখানে আগুন ধরে যায়। এর আগের দিন একই টার্মিনালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। হামলার পর বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকালও এর কার্যক্রম বন্ধ রাখার সময় বাড়িয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে সৌদি আরবের হামলার জবাবে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা দেশটির বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার
হুশিয়ারি পুনর্ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে হুথিদের পরিচালিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশন জানিয়েছে, ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি রিয়াদ।
রিয়াদের বিমানবন্দরে নতুন হামলার পর সৌদি রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা। বিস্ফোরণের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। এর আগে বিমানবন্দরের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করার কথা জানায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। তবে নতুন হামলায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
শনিবারের হামলার পর সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, স্থানীয় সময় ওই দিন বিকালে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হামলার শিকার হয়। রাজ্যের বেসামরিক বিমান চলাচল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবে এ ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষ প্রথমে জানায়, কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং হতাহতের সংখ্যা নিরূপণ করা হচ্ছে।
তবে হাসপাতাল সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে পরে হতাহতের ব্যাপকতা সামনে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিমানবন্দরের ভেতরে বিস্ফোরণের পর মেঝেতে একাধিক আহত ব্যক্তিকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। আহতদের সরিয়ে নিতে এক ডজনের বেশি অ্যাম্বুলেন্স বিমানবন্দরে ছুটে যায়। আহতদের মধ্যে অনেকেই সৌদি নাগরিক। অন্তত পাঁচজন সৌদি নাগরিককে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। কয়েকজনকে হেলিকপ্টারে হাসপাতালে নেওয়া হয়। রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদেরও ডেকে পাঠানো হয়। চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, আহতদের অনেকের অবস্থা গুরুতর ছিল।
শনিবারের হামলায় নিহত ১২ জনের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি, একজন ফিলিস্তিনি, একজন মার্কিন নাগরিক, একজন মিশরীয়, একজন জর্ডানীয়, একজন সিরীয় ও একজন সুদানি রয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশি দুই নিহত হলেন— বগুড়ার শাহজাহানপুর থানার মাদলা এলাকার মো. রফিকুল ইসলাম ও মোছা. শাহেরা বেগম দম্পতির ছেলে মো. শাহেদ আহম্মেদ এবং কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থানার বদরপুর এলাকার মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ ও জাহানারা বেগম দম্পতির ছেলে মুহাম্মাদ নাসরুল্লাহ বদর। নিহত মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ বদর পেশায় মাদ্রাসাশিক্ষক।
লালবাগ শাহী মসজিদের পেশ ইমাম ও লালবাগ জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মুফতি নাসির উদ্দিন গতকাল বলেন, নিহত মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ বদর জামিয়া রবিউল উলুম কামরাঙ্গীরচর মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনিসহ মোট ৪৫ জন ওমরা হজ করতে শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিমানবন্দরে হামলায় আহত হন। ঘটনার পর দুজন নিখোঁজ ছিলেন। পরে দুজনার মধ্যে মুহাম্মদ নাসরুল্লাহ বদরের লাশ পাওয়া যায়। এখনও একজন নিখোঁজ রয়েছেন; তার নাম, মাদ্রাসাশিক্ষক মাওলানা মুফতি নুরুল্লাহ। তিনি বলেন, হামলার ঘটনায় দুই পা হারিয়েছেন মাদ্রাসাশিক্ষক শরাফত হোসেন। আর এক পা হারিয়েছেন মাওলানা আবু সাঈদ।
এদিকে গতকাল বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবা?দিক?দের মুখোমুখি হয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় প্রাণ হারানো দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন চার বাংলাদেশির চিকিৎসার সার্বিক খোঁজখবর রাখছে দূতাবাস। বাংলাদেশ সরকার নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছে।
হামলার পর সৌদি আরবের বিমানবন্দর এড়িয়ে চলতে নিজ নিজ নাগরিকদের সতর্ক করেছে কয়েকটি পশ্চিমা দূতাবাস। স্পেনের দূতাবাস সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় বিমানবন্দরে নতুন হামলার কথা উল্লেখ করে নাগরিকদের সতর্ক করেছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা এ হামলা চালিয়েছে বলে বার্তায় উল্লেখ করা হয়। কানাডার দূতাবাস রিয়াদের বিমানবন্দরে চলমান সামরিক তৎপরতার কারণে সতর্কতা জারি করে। জার্মান দূতাবাসও সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা দেয়।
এএফপিকে এক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, শনিবার গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ১২টার দিকে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়।
রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন পক্ষ। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস হুথিদের প্রাণঘাতী হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এ ঘটনায় তিনি মর্মাহত। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। এসব হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, নিরপরাধ মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে এসব হামলা। এগুলো এখনই বন্ধ হওয়া উচিত। হামলায় একজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করতে হবে এবং এ অঞ্চলের সব দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হামলাকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের প্রকাশ্য লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেশটির সব পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানায় আবুধাবি।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আল-আলিমি বাওয়াজির বলেছেন, বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোয় হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করতে বিমান সংস্থা, নৌপরিবহন কোম্পানি, কর্মী ও যাত্রীদের আবারও সতর্ক করেছেন। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো হুথিদের বাহিনীর হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং সেগুলো তাদের সামরিক অভিযানের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তবে মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দরকে সম্ভাব্য হামলার বাইরে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সানা সেন্টারের জ্ঞান উৎপাদনবিষয়ক নির্বাহী পরিচালক ইয়াসমিন আল-এরিয়ানি আল জাজিরাকে বলেন, হুথিরা সৌদি আরবের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান জোরদার করছে তারা। পশ্চিম উপকূলের লড়াইয়ের পাশাপাশি তাইজ ও অধিক জনবসতিপূর্ণ এলাকায় তাদের তৎপরতা বাড়ছে।
আল-এরিয়ানির মতে, হুথিদের সামরিক তৎপরতা আরও বিস্তৃত হতে পারে। অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পাশাপাশি সীমান্তপারের হামলা চালিয়ে তারা আঞ্চলিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিস্তার ঘটেছে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতেও। প্রণালিটি দিয়ে বাইরে যাওয়ার পথে একটি ট্যাংকারের বাঁ পাশের অংশে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থা (ইউকেএমটিও)। সংস্থাটি জানায়, আঘাতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে নাবিকদের সবাই নিরাপদ আছেন এবং পরিবেশের ওপর কোনো প্রভাব পড়ার খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর উপসমন্বয়ক হাবিবোল্লাহ সাইয়ারি বলেছেন, প্রয়োজন হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা অব্যাহত রাখবে ইরানি বাহিনী। ইরানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে তিনি বলেন, শত্রুপক্ষের জাহাজে আঘাত হানা হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে আবার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তারা পাল্টা হামলা চালাবেন। এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার মতো সক্ষমতা ও সামর্থ্য ইরানের রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
