দিল্লির যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভের ঘটনায় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তিন নেতা সৌরভ দাস, আশুতোষ রঙ্কা ও অজিঙ্কা শিন্ডেকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের তিহার জেলে পাঠানোর প্রতিবাদে এবং যন্তর মন্তরকে আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদস্থল হিসেবে চালুর দাবিতে বুধবার সেখানে বিক্ষোভ করেন এসএফআই, ডিওয়াইএফআই, এনএসইউআই ও যুব কংগ্রেসের হাজার হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থক। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের হাতাহাতি হয়।
দিল্লির প্রাণকেন্দ্র যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা উঁচিয়ে প্রতিবাদ জানানোর অপরাধে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির শীর্ষ তিন নেতা সৌরভ দাস, আশুতোষ রঙ্কা এবং অজিঙ্কা শিন্ডেকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লির রাজনীতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে যন্তর মন্তরকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদস্থল হিসেবে বাতিল করা হয়। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এবং জাতীয় পতাকা হাতে শান্তি ভঙ্গের বন্ড ভেঙে সেখানে প্রবেশ করার অভিযোগে গতকাল সকালে এই তিন যুব নেতাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাদের তিহার জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই গ্রেপ্তারির ঘটনা ছড়িয়ে পড়তেই দিল্লির রাজপথে গতকাল নতুন করে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
বুধবার সকালে বামপন্থি ছাত্রসংগঠন এসএফআই, যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআই, কংগ্রেসের ছাত্র শাখা এনএসইউআই এবং ইন্ডিয়ান ইউথ কংগ্রেসের হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক ফিরোজ শাহ রোড থেকে যন্তর মন্তর অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং যন্তর মন্তরকে সর্বসাধারণের প্রতিবাদের জায়গা হিসেবে পুনর্বহালের দাবি জানান। গতকাল বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরের কাছে পৌঁছালে পুলিশি ব্যারিকেডের সামনে বাধা পান। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড টপকে এগোতে গেলে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও হাতাহাতি হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে এসএফআই, ডিওয়াইএফআই এবং এনএসইউআইয়ের বহু কর্মীকে আটক করে সংসদ স্ট্রিট থানায় নিয়ে যায়।
সিজেপি নেতাদের তিহার জেলে পাঠানোয় তীব্র প্রতিক্রিয়া
সিজেপি নেতাদের তিহার জেলে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ভারতের প্রধান বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এই গ্রেপ্তারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, দেশের জাতীয় পতাকা হাতে যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো কোনো অপরাধ হতে পারে না। দেশের যুবসমাজকে এভাবে জেলে বন্দি করে রাখা সরকারের চরম কাপুরুষতার পরিচয়। রাহুল গান্ধী একই সঙ্গে আহত ও নিগৃহীত ছাত্র-তরুণদের পুলিশের সব নির্যাতন ও বেআইনি আটকের ভিডিও বা ছবি প্রমাণ হিসেবে ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার এবং বিরোধী দলগুলো এই অধিকার রক্ষা করতে শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে।
আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল সিজেপি নেতাদের জেলে পাঠানোর ঘটনাকে চরম হাস্যকর বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নিজের দেশের পতাকা ওড়ানো কি এখন থেকে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে? এ ছাড়া জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্সের মুখপাত্র তানভীর সাদিক, সিপিআইয়ের (এমএল) সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং বিশিষ্ট অভিনেতা-কর্মী প্রকাশ রাজ এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেন। তানভীর সাদিক বলেন, তরুণরা কেবল সরকারের কাছে জবাব চাইছেন। তাদের কথা শোনার বদলে জেলে পুরে দেওয়া গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। অবিলম্বে তাদের মুক্তি দিয়ে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করার দাবি জানান তিনি। দীপঙ্কর ভট্টাচার্য দেশবাসীকে যন্তর মন্তরকে পুনরায় নিজেদের অধিকার হিসেবে ছিনিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে গতকাল দিল্লি পৌঁছে এই ঘটনার তুলনা টেনে বলেন, ব্রিটিশ আমলে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা জাতীয় পতাকা হাতে নিলে যেভাবে গ্রেপ্তার হতেন, আজ মোদি সরকারও ঠিক একই আচরণ করছে। এর জবাবে আগামীকাল শুক্রবার বিকেল ৫টায় দিল্লির কনট প্লেসে ‘লহরা দো তিরাঙ্গা’ নামে এক বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দেন তিনি।
বিরোধী শিবিরের এসব অভিযোগের জবাবে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন। সিজেপিকে তিনি সরাসরি আম আদমি পার্টির ‘বি-টিম’ বলে উল্লেখ করেন। রেখা গুপ্তা দাবি করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দিল্লির সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। যন্তর মন্তরে অহেতুক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে শহরের স্থায়িত্ব নষ্ট করার চেষ্টা চলছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলোতে বা পাঞ্জাবে যখন অন্যায় ঘটনা ঘটে, তখন এই সংগঠনগুলোকে কেন প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না?
