রাজধানীর স্বামীবাগে অনুমোদিত নকশার একাধিক শর্ত লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে নোটিশ দেওয়ার পরও একটি ১০ তলা ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিদর্শনে ভবনের চারপাশের বাধ্যতামূলক খালি জায়গা না রাখা, বিভিন্ন পাশে স্ল্যাব বাড়ানো, সিঁড়ি ও লিফটের অবস্থান পরিবর্তন এবং অপসারণের শর্ত থাকা পুরনো ভবন বহাল রাখার মতো অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। এ ঘটনায় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নবধারা বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নকশা দাখিলের নির্দেশ এবং জমির মালিক শেখ গোলাম মোহাম্মদ গংকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা নির্ধারিত সময়ে জবাব দেননি। অন্যদিকে নোটিশ দিয়েই দায় সেড়েছে রাজউকও। আবার নকশার ব্যত্যয় সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ থাকলেও কাজ বন্ধ রাখেনি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান।
রাজউকের জোন-৬-এর পরিচালকের দপ্তর থেকে গত ১৫ জুলাই জারি করা কারণ দর্শানোর নোটিশ ও সংযুক্ত পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। নোটিশ অনুযায়ী, ওয়ারী থানার ৬৬/১ স্বামীবাগের ইলিয়াস ইয়াসিন সোসাইটি নামের ভবনটির ১০ তলার নকশা ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে সরেজমিন পরিদর্শনে অনুমোদিত নকশার সঙ্গে নির্মাণকাজের একাধিক অমিল পায় রাজউক।
রাজউকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে ভবনের বিভিন্ন পাশে অনুমোদিত নকশার বাইরে স্ল্যাব বাড়ানোর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ভবনের পূর্ব পাশে অনুমোদিত নকশার তুলনায় ১ দশমিক ৪৬ মিটার, পশ্চিম পাশে ১ দশমিক ৮৩ মিটার এবং উত্তর পাশে শূন্য দশমিক ৯০ মিটার স্ল্যাব বর্ধিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবনের চারপাশে নির্ধারিত পরিমাণ খালি জায়গা রাখা হয়নি।
ভবনের সীমানা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে যে বাধ্যতামূলক খালি জায়গা রাখতে হয়, তা সেটব্যাক হিসেবে পরিচিত। ভবনের আলো-বাতাস চলাচল, নিরাপত্তা ও আশপাশের স্থাপনার সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবধান বজায় রাখার ক্ষেত্রে এ জায়গা গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেটব্যাক না রাখার বিষয়টিও রাজউকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে। আর নির্দিষ্ট পরিমাণ সেটব্যাক না থাকলে ভবনটি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
প্রতিবেদনে ভবনের সিঁড়ি ও লিফটের অবস্থান পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া অনুমোদিত নকশায় ভবনের দক্ষিণ পাশে প্লে-গ্রাউন্ড দেখানো জায়গায় একটি পুরনো তিন তলা ভবন রয়েছে। ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের শর্ত অনুযায়ী ওই ভবন ভেঙে অপসারণ করার কথা থাকলেও তা মানেনি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিকগণ।
এসব ব্যত্যয়ের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে জমির মালিক শেখ গোলাম মোহাম্মদ গংকে ৩০ দিনের সময় দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়। নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ ও সংশ্লিষ্ট বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে কেন ভবন মালিক ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তার ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে সন্তোষজনক জবাব না দেওয়া কিংবা চিহ্নিত ত্রুটি সংশোধন না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে রাজউক। কিন্তু তাতেও কোনো কর্ণপাত করেনি তারা।
নকশাবহির্ভূত ইমারত নির্মাণের বিষয়ে রাজউক কঠোর অবস্থানে আছে বলে জানিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল। এ বিষয়ে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, আগে যা ঘটে গেছে সেগুলো হয়তো ভিন্ন আঙ্গিকে দেখা হবে। কিন্তু নতুন যেসকল ভবন নির্মাণ হচ্ছে সেখানে একবিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান জিরো টলারেন্স। কেউ যদি রাজউকের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করে তারা অকুপেন্সি সনদ পাবে না। আর অকুপেন্সি সনদ না পেলে সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ সব সার্ভিসের সংযোগ পাবে না। সেটা হবে একটা পরিত্যাক্ত ভবন। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ ধরনের নিয়মবর্হির্ভূত ভবনের ক্ষেত্রে রাজউকের কারও গাফিলতি থাকলে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
এর আগে গত ২১ জুন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নবধারা বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নকশা দাখিলের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে নকশা দাখিল ও পরবর্তী নোটিশের জবাব দেয়নি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। রাজউকও এ বিষয়ে পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ভঙ্গ করে এভাবে বহুতল নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে নবধারা বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান মিয়া কোনো জবাব দিতে রাজি নন। তিনি সমস্ত অভিযোগের বিষয় জানার পর বলেন, ‘আমার কিডনিতে পাথর ধরা পড়েছে; কথা বলতে পারব না।’ এই বলে ফোন কেটে দেন।
নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ বন্ধে সরকারও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। গত ১৯ আগস্ট গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব মো. ওবায়দুল রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভা শেষে জানানো হয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীতে নকশাবহির্ভূত ভবনের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসহ সব ধরনের ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে রাজউক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ বিষয়ে নিয়মিত তদারকির নির্দেশনা এবং প্রতিবেদন প্রতি মাসে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার কথাও জানানো হয়। এ ছাড়া ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত কমিটির বৈঠকেও এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
