ভোরে বই কাঁধে নিয়ে কয়েক কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া, দুপুরে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে সহায়তা করা, আর রাতে কেরোসিনের কুপির আলোয় পড়াশোনা—এভাবেই কেটেছে শৈশব। অভাব-অনটন আর নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলা সেই ছেলেটিই এবার ৪৫তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়ে গেজেটভুক্ত হয়েছেন। তিনি কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের মনিরঝিল গ্রামের ইউসুফ জালাল।
তাঁর এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে বেড়ে ওঠা স্বপ্নবাজ তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার এক গল্প।
ইউসুফ জালাল রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মনিরঝিলের পাহাড়পাড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসলাম ও রাবেয়া খাতুন দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। সীমিত সামর্থ্যের সংসারে তাঁর বেড়ে ওঠা। মনিরঝিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। পরে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য প্রতিদিন বাঁকখালী নদী পার হয়ে যেতে হতো কাউয়ারখোপ হাকিম রকিমা উচ্চ বিদ্যালয়ে। দুর্গম পথ আর নানা সীমাবদ্ধতা তাঁর শিক্ষার অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি।
মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন ইউসুফ। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় তাঁকে পৌঁছে দেয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের পথে।
পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের শিক্ষা ব্যয় মেটানো এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও সামলাতে হয়েছে তাঁকে। কলেজের প্রথম বর্ষ থেকেই টিউশনি শুরু করেন ইউসুফ। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেও তা অব্যাহত রাখেন। পাশাপাশি বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে পাঠদান করেন। চাকরিতে যোগদানের আগ পর্যন্ত শিক্ষকতার এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও এই অভিজ্ঞতা তাঁকে সহায়তা করে।
নিজের সংগ্রাম ও সাফল্যের পেছনের গল্প তুলে ধরে ইউসুফ জালাল বলেন, “সংগ্রাম ছাড়া পৃথিবীতে কেউ টিকে থাকতে পারে না। তবে আমার জেদ ছিল কিছু একটা হওয়ার। টিউশন ও কোচিংয়ে পড়ানোর অভিজ্ঞতাই আমাকে চাকরির পরীক্ষায় এগিয়ে রেখেছে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মা-বাবার অক্লান্ত পরিশ্রমই আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।”
শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ইউসুফের মনে গেঁথে ছিল শৈশব থেকেই। বিশেষ করে বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে লক্ষ্য স্থির রাখতে সহায়তা করেছে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই তিনি বেছে বেছে কয়েকটি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেন। বিসিএসে তাঁর পছন্দের তালিকার প্রথম দিকেই ছিল সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার।
২০২৪ সালের ১০ জুন তিনি চট্টগ্রামের ইস্পাহানি ফার্টিলাইজার স্কুল অ্যান্ড কলেজে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ৪৫তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়ে গেজেটভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পথে যুক্ত হয় নতুন অধ্যায়।
নিজের অর্জনের অনুভূতি প্রকাশ করে ইউসুফ বলেন, “স্কুলে পড়ার সময় থেকেই স্বপ্ন দেখতাম শিক্ষক হব, বিশেষ করে বিসিএস ক্যাডার থেকে। তাই হাতে গোনা কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছি। বিসিএসে প্রথম দিকের পছন্দ ছিল শিক্ষা ক্যাডার। ছোটবেলার সেই স্বপ্ন আল্লাহ পূরণ করেছেন, এজন্য মহান রবের কাছে অশেষ শুকরিয়া।”
ইউসুফের বন্ধু, রুপালি বাংলাদেশের রামু প্রতিনিধি ও গ্লোবাল ইংলিশ একাডেমির পরিচালক এস. আই. রায়হান মনে করেন, ইউসুফের এই সাফল্য প্রমাণ করে, সীমিত সুযোগ-সুবিধা স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় প্রত্যয় মানুষকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, পাহাড়ি পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া, কেরোসিনের কুপির আলোয় পড়াশোনা, জীবিকার প্রয়োজনে টিউশনি এবং শেষ পর্যন্ত বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারে জায়গা করে নেওয়ার এই পথচলা অনেক তরুণের জন্য অনুকরণীয়। মনিরঝিলের পাহাড়পাড়া থেকে উঠে আসা ইউসুফ জালালের এই অর্জন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সম্ভাবনাময় তরুণদের নতুন করে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
