প্রথম সিজনের পরে ফের সিরিয়াল কিলিংয়ের রহস্যভেদে চিত্রা বসু। ‘বীরাঙ্গনা ২’ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
খুনের রহস্য সমাধান সহজ নয়। তবে সিরিয়াল কিলিংয়ের আততায়ীকে ধরা বোধহয় আরও অনেক অনেক কঠিন। সাধারণ খুনের নেপথ্যে থাকতে পারে হিংসা, নৃশংসতা, রাজনীতি, পরিস্থিতি কিংবা শত্রুতা। সিরিয়াল কিলিং সেখানে এসবের পাশাপাশি অনেক বেশি জটিল মনস্তত্ত্বের ফসল। আর তাই তাতে হত্যার ধারাবাহিকতা রুখে দিতে হলে খুনিকে চেনাটাই শুধু যথেষ্ট নয়। বরং তার মনের জট, নিষ্ঠুরতা-নৃশংসতার খিদের সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিয়ে চিনে নিতে হয় পরবর্তী পদক্ষেপের ইঙ্গিত। তবেই পরের খুনটাকে ঠেকিয়ে দেওয়া সম্ভব।
সেই টানটান লড়াইয়ের গল্পই উঠে এল ‘বীরাঙ্গনা ২’-এর কাহিনিতে। নির্ঝর মিত্রের পরিচালনায় ইনস্পেক্টর চিত্রা বসু (সন্দীপ্তা সেন) পর্দায় ফিরলেন আরও এক জটিল সিরিয়াল কিলিংয়ের রহস্য সমাধানে। সঙ্গে এসিপি ধীরজ সিনহা (প্রতীক দত্ত), সাব ইনস্পেক্টর উমা (প্রীতি সরকার) এবং সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ জিকো (বিশালজিৎ সরকার)।
গল্পের শুরু এক ভয়ানক হত্যাকাণ্ডে। বাড়ি থেকেই উদ্ধার হয় নামী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার পৃথার নাক কাটা রক্তাক্ত মৃতদেহ। তোলপাড় পড়ে যায় কলকাতা জুড়ে। বিষয়টা ভাইরাল হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়াতেও। ঘটনার তদন্তভার পায় চিত্রা। প্রথমে মেয়েটির প্রেমিক, মেকআপ আর্টিস্ট বা ফ্ল্যাটের নিরাপত্তারক্ষীকে আটক করলেও শুরু থেকেই তার মনে হতে থাকে বিষয়টা এতটাও সহজ নয়। এসপি (শুভ্রজিৎ দত্ত) তদন্তকারী দলে নিয়ে আসেন চিত্রার ‘ধীর স্যার’ অর্থাৎ ধীরজকে। ধীরই মনে করিয়ে দেয়, মাসখানেক আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় রেললাইনে উদ্ধার হওয়া এক বধূর মৃতদেহেও একইভাবে নাক কাটা ছিল। দুটো হত্যার গতিপ্রকৃতি সিরিয়াল কিলিংয়ের দিকেই ইঙ্গিত করতে থাকে। অতএব এসআইটি গড়ে তদন্তকারী দলে টানা হয় উমা এবং জিকোকেও। ইতিমধ্যে একই কায়দায় খুন হয়ে যায় আরও এক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। এই পেশার মেয়েদের প্রতি আক্রোশের কারণ, খুনির পরিচয় ও মোডাস অপারেন্ডির খোঁজে হন্যে হয়ে হাতড়াতে থাকে চিত্রা এবং ধীর। এ সবের মাঝেই টালমাটাল হয়ে পড়ে চিত্রার ব্যক্তিগত জীবনও। সৌজন্যে তার স্বামী অনিরুদ্ধ (আদিত্য সেনগুপ্ত)।
ইতিমধ্যে দর্শকের অবশ্য চেনা হয়ে যায় আততায়ীকে (তথাগত চৌধুরী)। জানা হয়ে যার তার হত্যাপদ্ধতিও। কিন্তু চিত্রা, ধীর ও তাদের বাহিনী কি বুঝতে পারবে তার মোটিভ কিংবা খুনের চলনপথ? কোথা থেকে কীভাবে তারা নাগাল পাবে খুনির? অপরাধ থেকে অপরাধী মনস্তত্ত্বের চোরা অলিগলি ধরে সেই রহস্যভেদের পথেই এগিয়েছে গল্প।
সাত পর্বের এই ঝকঝকে ক্রাইম থ্রিলার সিরিজে শুরু থেকেই যেটা নজর কাড়ে, তা হল গল্প বলার স্মার্টনেস। ছোট ছোট পর্বে টানটান এগোয় রহস্য সমাধান। দৃশ্যায়ন হোক বা সংলাপ— কোথাও বাড়তি মেদ নেই এতটুকুও। ইনফ্লুয়েন্সারদের দুনিয়া, তাদের জীবনযাপন, হতাশা থেকে ঈর্ষার নিখুঁত ছবি যেমন নজর কাড়ে, তেমনই ভাল লাগে সোশ্যাল মিডিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকা এই প্রজন্ম, ইনফ্লুয়েন্সারদের ঘিরে আমজনতার আগ্রহ, মনের গভীরে লুকিয়ে রাখা পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব কিংবা যৌনতার হাতছানির ডিটেলিং। এর উল্টোপিঠে পুলিশি তৎপরতা ও বুদ্ধিমত্তার মিশেলে রহস্যভেদ, অফিসারদের নিজস্ব জীবন, পেশাগত জটিলতা মিলিয়ে তদন্তের গোটা সফরটাই রীতিমতো উপভোগ্য হয়ে ওঠে। আর হ্যাঁ, ছোট্ট দুটো দৃশ্যে অ্যাডভোকেট অচিন্ত্য আইচের সহকারী ইনফর্মার ভীমের (দেবরাজ ভট্টাচার্য) হাত ধরে দুই সিরিজের ক্রসওভারটাও বেশ! এই সবটার জন্য অবশ্যই কুর্নিশ প্রাপ্য নির্ঝর ও তাঁর ইউনিটের।
অভিনয়ে সন্দীপ্তা যথারীতি ভীষণ জীবন্ত। রহস্য সমাধানের খিদে, না পারার যন্ত্রণা থেকে মানসিক টানাপোড়েন, সবটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ফুটে ওঠে তাঁর অভিনয়ে। অপরাধের হদিশ থেকে চিত্রার প্রতি অব্যক্ত প্রেম, সবেতেই সমানতালে মন কাড়েন প্রতীকও। তবে চমকে দিয়েছেন যিনি, তিনি পর্দার আততায়ী। সিরিয়াল কিলারের মানসিক অসুস্থতা, নৃশংসতা থেকে ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনের হতাশা— তথাগত সবেতেই নিখুঁত। উমা বা জিকোর ছোট ছোট চরিত্রে যে যাঁর মতো করে চোখ টানেন প্রীতি এবং বিশালজিৎ। সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিতে একাধারে স্নেহপ্রবণ ও দায়িত্বশীল এসপি হিসেবে ভাল লাগে শুভ্রজিৎকে। স্বল্প পরিসরে ততটাই বিবমিষা জাগায় ঈর্ষাপরায়ণ এবং কথায় কথায় মেয়েদের অপমান করতে চাওয়া, চিত্রার প্রাক্তন বস বলরাম হিসেবে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের দুরন্ত অভিনয়। একেবারে ছোট্ট এক চরিত্রে নজর কেড়ে ছেড়েছেন সুদীপা বসুও।
https://www.youtube.com/watch?v=TTaC77AoBTQ
তবে কয়েকটা ছোট্ট জিনিস খামতির খাতাতেও থাকে। যেমন, এত বুদ্ধিদীপ্ত, অভিজ্ঞ অফিসার হওয়া সত্ত্বেও চোখের সামনে কিছু গরমিল বা ক্লু চিত্রা কিংবা ধীরের নজর এড়িয়ে যায়। আততায়ী নিজে এগিয়ে এসে সেগুলো চিনিয়ে না দিলে তাদের মাথায় আসে না সে সব। আবার ইনফ্লুয়েন্সারদের ফ্ল্যাটের অন্দরসজ্জাগুলোও মোটের উপরে কাছাকাছি ধাঁচের, সেটা না হলেও হয়তো চলত। তা ছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ জিকোকে জেন জি প্রমাণ করতে প্রত্যেকটা সংলাপেই এই প্রজন্মের পরিচিত শব্দবন্ধের ফুলঝুরি ছোটানো কি খুব জরুরি ছিল? আরও একটা বিষয় মনে ধরেনি। তা হল ধীরজের পরিণতি। চিত্রার সবচেয়ে পছন্দের সহকর্মী তথা মনের দোসর এই ঝকঝকে অফিসার পর্দায় থাকলে কি মেয়েদের কৃতিত্ব তার প্রাপ্য প্রশংসার পুরোটা পেত না?
তবু নির্ঝরের পরিচালনা আর অনবদ্য অভিনয়ের জৌলুসেই এই খামতিগুলো দাগ কাটেনি সেভাবে। বলা ভাল, স্বছন্দে এড়িয়ে যাওয়াই যায়। টানটান রহস্যভেদ আর শেষ মুহূর্ত অবধি দর্শককে বসিয়ে রাখা— ভাল থ্রিলারের খাতায় নাম তুলতে আর কিছু কি লাগে?
