অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন দবিরুল ইসলাম (৪৫)। তবে প্রতিদিন কাজ পান না। ছয় সদস্যের সংসারে চার সন্তানকে নিয়ে তার দিন কাটে টানাপোড়েনে। যেদিন কাজ জোটে না, সেদিন পরিবারের খাবার ও অন্যান্য খরচ মেটাতে ধারদেনা করতে হয়, নয়তো প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কোনো মতে দিন পার করেন।
অন্যদিকে, একটি বেসরকারি এনজিওতে চাকরি করেন দুলাল হক (৩৭)। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে ঠাকুরগাঁও শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। প্রতি মাসে বেতন পেলেও দুই সন্তানের পড়াশোনা, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল এবং খাবারের খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় তাকে। মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতনের টাকা ফুরিয়ে আসে। বাধ্য হয়ে কখনো কখনো ধারদেনা করতে হয়।
দবিরুলের আয় নির্ভর করে কাজ পাওয়ার ওপর, আর দুলালের আয় নির্দিষ্ট মাসিক বেতনের ওপর। পেশা ও আয়ের ধরন আলাদা হলেও দুজনের সংকটের জায়গা এক—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মেটাতে গিয়ে সংসারের অন্য খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের বাজারে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল, মাছ, মাংস ও মুরগিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যে এমন চাপে রয়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। আগাম শীতকালীন সবজি বাজারে উঠতে শুরু করায় কিছু সবজির দাম কমেছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। তবে তাতে সামগ্রিক বাজারব্যয়ে স্বস্তি ফেরেনি।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি বাজার, রোড বাজার, বাসস্ট্যান্ড বাজার ও গোধূলী বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
দিনমজুরের আয়ে ৬ জনের সংসার
দবিরুল ইসলাম অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করে যে টাকা পান, তা দিয়েই চলে ছয় সদস্যের সংসার। দিনে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পেলেও প্রতিদিন কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কাজ না থাকলে আয়ও বন্ধ থাকে। অথচ পরিবারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ থেমে থাকে না।
প্রতিদিনের বাজার করতে গিয়ে চাল, ডাল, তেল ও সবজি কেনার পর পরিবারের অন্য প্রয়োজন মেটানোর মতো টাকা থাকবে কি না, তা নিয়ে হিসাব করতে হয় তাকে। কোনো দিন কাজ না পেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পণ্যের দামে সামান্য বৃদ্ধি হলেও তার মতো অনিয়মিত আয়ের মানুষের সংসারে বড় চাপ তৈরি হয়।
বেতন থাকলেও মাস শেষে ধারদেনা
দুলাল হকের সংকটের ধরন কিছুটা ভিন্ন। বেসরকারি এনজিওতে চাকরি করায় প্রতি মাসে নির্দিষ্ট বেতন পান তিনি। কিন্তু স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে শহরে বসবাসের কারণে তার খরচের তালিকাও দীর্ঘ। দুই ছেলের পড়াশোনা, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল, খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে বেতনের টাকা মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে আসে। ফলে মাসের শেষ দিকে ধারদেনা করতে হয় তাকে।

নিয়মিত আয় থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও সংসারের অন্যান্য ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। দবিরুলের মতো কাজ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা তার নেই, কিন্তু নির্দিষ্ট বেতনে বাড়তি ব্যয় মেটানোর সংকট রয়েছে।
৩ মাসে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫-১০ টাকা
বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ে গুটি চাল প্রতি কেজি গুটি ৫০ টাকা, সুমন সর্ণ ৫৫ টাকা, ২৮ চাল ৫৫ টাকা, মিনিকেট ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া গত ৩ মাসে পাইকারি বাজারে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চালের দাম গত ৩ মাসে ৮০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। 1
ডাল ও তেলেও বাড়তি খরচ
বর্তমানে মসুর ডাল প্রতি কেজি ১৫০ টাকা, হাইব্রিড মোটা ডাল ৯০ টাকা, ছোলা বুট ১১০ টাকা এবং অ্যাংকার ডাল ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত তিন মাসে ডালের দাম কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে।
অন্যদিকে, খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২১০ টাকা এবং এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত তিন মাসে খোলা তেলের দাম লিটারে ৮ থেকে ১০ টাকা এবং বোতলজাত তেলের দাম পাঁচ টাকা বেড়েছে। সে হিসাবে তিন মাস আগে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ছিল ২০০-২০২ টাকা এবং বোতলজাত তেল ১৯৯ টাকা লিটার।
শীতের সবজিতে কিছুটা স্বস্তি, সব পণ্যে নয়
বাজারে আগাম শীতকালীন সবজি হিসেবে শিম, ফুলকপি ও মুলা উঠতে শুরু করেছে। শীতকালীন সবজি আসতে শুরু করায় বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে প্রায় পাঁচ থেকে ১০ টাকা কমেছে।

তবে বেগুন, পটল, কাকরোল, ধুন্দল ও করলার দাম তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। মিষ্টি কুমড়া, লাউ, ঢ্যাড়স, কাচা কলা ও পুইশাকের দামও তাদের ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে। কিছু সবজির দাম কমলেও চাল, ডাল, তেল ও প্রাণিজ আমিষের উচ্চমূল্যের কারণে সামগ্রিক বাজারব্যয়ে স্বস্তি ফিরছে না।
মাছ-মাংস কিনতেও বাড়তি টাকা
বাজারে বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৬০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩১০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত তিন মাসে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা, সোনালি মুরগির ৩০ থেকে ৬০ টাকা এবং দেশি মুরগির ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে।
গত তিন মাস আগে ব্রয়লার মুরগির কেজি ছিল ১৪০-১৫০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৫০-২৮০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৪৭০-৫০০ টাকা।
এ সময়ে খাসির মাংসের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং গরুর মাংসের দাম ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে খাসির মাংস প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং গরুর মাংস ৭৫০টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে তিন মাস আগে খাসির মাংসের দাম ছিল ৯৫০-১,০০০ টাকা এবং গরুর মাংস ৬৭০-৭০০ টাকা কেজি।
মাছের দামও প্রজাতিভেদে কেজিতে ৩০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে ডিমের দাম হালিপ্রতি ৪৪ টাকা এবং ডজন ১৩০ টাকা। ডিমের দাম গত এক মাসে ওঠানামা করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব, দাবি ব্যবসায়ীদের
ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্য আনা-নেওয়ার ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও।
কালীবাড়ি বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, জ্বালানি তেলের সঙ্গে ট্রাকের ট্রিপ খরচও বেড়েছে। দূরপাল্লার প্রতি ট্রাকে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে এই ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কাচাবাজারের পণ্যের দাম বৃদ্ধি বা কমার বিষয়টি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফলন ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সবজির দামেও এর প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে সবজি শহরের বাজারে আনতে হয়। এ ছাড়া গরমে সবজি দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
চাল ব্যবসায়ী হামিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত কয়েক মাসে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। পাইকারি বাজারে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে, ফলে খুচরা বাজারেও দাম বাড়ছে। পরিবহন খরচসহ অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদেরও আগের তুলনায় বেশি খরচ করতে হচ্ছে। তবে ক্রেতারা এখন হিসাব করে চাল কিনছেন। দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষ ও নিম্ন আয়ের ক্রেতাদের ওপর চাপ পড়ছে।
বাজার করতে আসা দিনমজুর মো. ইসলাম, তরিকুল ও ভবেশ চন্দ্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দিন আনি, দিন খাই। প্রতিদিন যে টাকা আয় করি, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুর দাম বেশি। বাজারে এসে হিসাব করে জিনিস কিনতে হয়, তারপরও প্রয়োজনীয় সবকিছু কেনা সম্ভব হয় না। আয় তো আর বাজারদরের সঙ্গে বাড়ে না। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে আমরা সাধারণ মানুষ কীভাবে সংসার চালাব? পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঠাকুরগাঁও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এ.এস.এম. মাসুম-উদ-দৌলা ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ালে, পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করলে কিংবা অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করলে অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় আমাদের অভিযান ও তদারকি অব্যাহত রয়েছে। কোনো পণ্য কেনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া হলে ভোক্তাদের অধিদপ্তরে অভিযোগ জানানোর অনুরোধ করছি।
এএমকে
