২০১০-১১ থেকে ২০১৮-১৯ মৌসুমের মধ্যে তথাকথিত এ বিগ সিক্স মোট পাঁচবার শীর্ষ ছয়টি স্থানে ছিল। বাকি সময়ে তারা দুবার শীর্ষ সাতের মধ্যে ও একবার শীর্ষ আটের মধ্যে থেকে মৌসুম শেষ করেছিল।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ‘বিগ সিক্স’খ্যাত ক্লাব আর্সেনাল, চেলসি, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও টটেনহ্যাম হটস্পার্স প্রায় দেড় যুগ কর্তৃত্ব করেছে। তারা শুধু যে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থানগুলোতেই আধিপত্য বিস্তার করত তা নয়, বরং তাদের ছিল সবচেয়ে বড় সমর্থকগোষ্ঠী ও ব্যাপক আর্থিক সক্ষমতা। পাশাপাশি লিগের সবচেয়ে সফল দলও ছিল তারাই।
সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে টটেনহ্যাম ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে টেবিলের একেবারে নিচের দিকে লড়াই করতে দেখা গেছে, অন্যদিকে অ্যাস্টন ভিলা, ব্রেন্টফোর্ড ও ব্রাইটনের মতো দলগুলো টেবিলের শীর্ষস্থানগুলোর জন্য লড়ছে। এর মধ্যে গত দশকজুড়ে লিগের সবচেয়ে প্রভাবশালী দল ম্যানচেস্টার সিটিও এখন এক অনিশ্চিত সময়ের মুখোমুখি। সম্প্রতি টানা নয় বছর ধরে আর্থিক নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে ক্লাবটি দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। অবশ্য আর্থিক দিক বিবেচনা করলে ‘বিগ সিক্স’ এখনো টিকে আছে, কারণ বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় করা শীর্ষ ১০টি ক্লাবের মধ্যে ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, স্পার্স (টটেনহ্যাম) ও চেলসি—সবাই রয়েছে।
মাঠের লড়াইয়ে ঐতিহ্যবাহী এ ‘বিগ সিক্স’ এখন কতটা রয়েছে, নাকি এ যুগের অবসান হতে চলেছে?
প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ২০১৫-১৬ মৌসুমে লেস্টার সিটির শিরোপা জয়, যার মালিকানায় এক থাই ধনকুবের। এটি ফুটবল ভক্তদের কল্পনাকে নাড়া দিয়েছিল, কারণ তখন বিগ সিক্সের বাইরের কোনো দলের পক্ষে চ্যাম্পিয়ন হওয়া তো দূরের কথা, কাছাকাছি পৌঁছানোও অসম্ভব মনে হতো। তবে লেস্টারের সেই জয়কে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল, কারণ পরবর্তী তিন মৌসুম বিগ সিক্স দলগুলো আবার শীর্ষস্থানগুলো দখলে নেয়।
প্রকৃতপক্ষে তাদের সঙ্গে বাকি দলগুলোর ব্যবধান তখন এতটাই বেশি ছিল যে, ওই তিন মৌসুমে ষষ্ঠ ও সপ্তম স্থানের মধ্যে সর্বনিম্ন ব্যবধানই ছিল ৮ পয়েন্টের। ২০১০-১১ থেকে ২০১৮-১৯ মৌসুমের মধ্যে তথাকথিত এ বিগ সিক্স মোট পাঁচবার শীর্ষ ছয়টি স্থানে ছিল। বাকি সময়ে তারা দুবার শীর্ষ সাতের মধ্যে ও একবার শীর্ষ আটের মধ্যে থেকে মৌসুম শেষ করেছিল।
এরপর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। পরবর্তী ছয় মৌসুমের মধ্যে মাত্র একটি মৌসুমে তারা সবাই একসঙ্গে শীর্ষ ছয়ে থাকতে পেরেছে, আর বাকি সময়ে অ্যাস্টন ভিলা, নিউক্যাসল ও ব্রাইটন কোনো না কোনো সময়ে এ স্থানগুলো দখল করেছে। বিশেষ করে টটেনহ্যাম বেশ সংগ্রাম করছে—গত দুটি মৌসুমের প্রতিটিতেই তারা রেলিগেশন জোনের ঠিক এক ধাপ ওপরে থেকে মৌসুম শেষ করেছে। এমনকি চলতি মৌসুমেও তাদের অবস্থা ভালো নয়, প্রথম ছয় ম্যাচের একটিতেও না জিতে মাত্র ৩ পয়েন্ট নিয়ে তারা বর্তমানে টেবিলের তলানি থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
মৌসুমের শুরুতে খুব বেশি ম্যাচ না হলেও গতকাল পর্যন্ত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছিল ১৩তম স্থানে, লিভারপুল নবম স্থানে। ২০২১-২২ মৌসুম থেকে চেলসি ও ইউনাইটেড দুবার শীর্ষ ছয়ের বাইরে শেষ করেছে, আর টটেনহ্যাম বাদ পড়েছে তিনবার—যার মধ্যে দুবারই তারা ১৭তম স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করে। গত তিন বছরে ঐতিহ্যবাহী ছয়টি ক্লাবের বাইরের দলগুলো শীর্ষ ছয়ের মধ্যে মোট পাঁচটি স্থান ছিনিয়ে নিয়েছে, যা এর আগের আট বছরের সম্মিলিত রেকর্ডের সমান।
একটি যৌথ শক্তি হিসেবে তাদের এ আধিপত্য হারানোর অন্যতম কারণ হলো অন্য ক্লাবগুলো এখন আর্থিক ব্যবধান কমিয়ে এনেছে। এর একটি বড় উদাহরণ নিউক্যাসল। ২০২১ সালে মালিকানায় বদল আসে। সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের নেতৃত্বে ৩০৫ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ হলে আমূল পরিবর্তন ঘটে নিউক্যাসলে। ২০২১-২২ মৌসুমে ১১তম স্থানে থাকা দলটি পরের মৌসুমেই চতুর্থ স্থানে চলে আসে এবং তার দুই মৌসুম পর পঞ্চম স্থানে থেকে বছর শেষ করে।
এদিকে, ব্রাইটনের মতো দলগুলো ডেটা ও স্মার্ট রিক্রুটমেন্টের ওপর ভিত্তি করে এ ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলছে। কম দামে প্রতিভাবান খেলোয়াড় কিনে পরে বিশাল মূল্যে বিক্রি করার ক্ষেত্রে ব্রাইটনের রেকর্ড বেশ প্রশংসনীয়। ২০২১ সালে তারা একুয়েডরের ১৯ বছর বয়সী মিডফিল্ডার মোইসেস কাইসেডোকে ইনডিপেনডিয়েন্তে থেকে মাত্র ৪ মিলিয়ন পাউন্ডে দলে ভেড়ায় এবং দুই মৌসুম পর চেলসির কাছে রেকর্ড ১১৫ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করে, যা সেই সময়ে ব্রিটিশ ফুটবলে একটি রেকর্ড ছিল। এছাড়া তারা স্পেনের খেলোয়াড় মার্ক কুকুরেয়াকে ১৫ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনে চেলসির কাছে ৬২ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করে এবং মাত্র ৭ মিলিয়ন পাউন্ডে আনা অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে ৫৫ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তিতে লিভারপুলের কাছে বিক্রি করে দেয়।
বিবিসি রেডিও ৫ লাইভ-এর ‘ফুটবল ডেইলি’ পডকাস্টে ব্রাইটনের স্পোর্টিং ডিরেক্টর মাইক কেভ বলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড় নিয়োগের কৌশল ও দর্শন এমন এক জিনিস, যা আমরা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে তুলেছি। ডেটা বা উপাত্তের বিষয়টি এখন অনেক বেশি নজর কাড়ছে, কারণ কয়েক বছর আগে অন্য ক্লাবগুলোর তুলনায় আমাদের এ পদ্ধতিটি বেশ নতুন বা অভিনব ছিল। আসলে এটি আমাদের পুরো প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাত্র। এটি আমাদের বিশ্বজুড়ে খুব কার্যকর উপায়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে পেতে সাহায্য করে, যার ফলে এ তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ট্রান্সফার মার্কেটে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারি।’
২০১৩ সালে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের বিদায়ের পর থেকে ধুঁকছে ম্যানইউ। তার সময়ে (২৬ বছর) ঈর্ষণীয় সাফল্য পেলেও পরে এর ধারেকাছেও যেতে পারেনি রেড ডেভিলরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক কোচ বদল করেও খুব একটা লাভ হয়নি। একই সময়ে চেলসি সাতজনকে কোচের দায়িত্বে এনেছে, টটেনহ্যাম পরিবর্তন করেছে ছয় কোচ। আর্সেনাল দেখিয়েছে যে ধৈর্য ধরলে তার সুফল পাওয়া যায়—২০১৯ সালে দায়িত্ব পাওয়া মিকেল আর্তেতাকে তারা দল গঠনের পর্যাপ্ত সময় দিয়েছিল এবং এর ফলস্বরূপ গানাররা গত মৌসুমে তাদের ২২ বছরের খরা কাটিয়ে জিতেছে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা।
প্রিমিয়ার লিগে বিগ সিক্সের ধারণাটি সবসময় ছিল না, তাই এর বিবর্তন এবং কারা এর অংশ হবে তা পরিবর্তন হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। ১৯৯২ সালে যখন এ লিগ প্রথম যাত্রা করে, তখন আর্সেনাল, এভারটন, লিভারপুল, ম্যানইউ ও টটেনহ্যামকে নিয়ে একটি ‘বিগ ফাইভ’ ছিল—যাদের সেই সময়ে সবচেয়ে বড় সমর্থকগোষ্ঠী ও আর্থিক সক্ষমতার অধিকারী মনে করা হতো। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে ম্যানইউ ও আর্সেনালের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে তা ‘বিগ টু’-তে রূপ নেয়। এরপর চেলসি ও লিভারপুল নিয়মিত শীর্ষ চারে জায়গা করে নিলে এটি ‘বিগ ফোর’-এ পরিণত হয়। ২০১০-১১ মৌসুমে ইংলিশ লিগের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শীর্ষ ছয়টি স্থান আর্সেনাল, চেলসি, লিভারপুল, ম্যানসিটি, ম্যানইউ ও টটেনহ্যামের দখলে যায়। এরপর ২০১৪-১৫, ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ মৌসুমেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটলে ‘বিগ সিক্স’ ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
১৯৬০-এর দশকে বার্নলি, টটেনহ্যাম, ইপসউইচ, এভারটন, লিভারপুল, ম্যানইউ, ম্যানসিটি ও লিডস—সব দলই লিগ শিরোপা জিতেছিল। প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়ন দল বিগ সিক্সের মধ্য থেকেই আসবে বলে ধারণা করি আমরা। তবু শীর্ষ ছয়টি স্থান শুধু তাদেরই দখলে থাকবে—এ ধারণা থেকে আমরা দূরে সরে আসছি। কারণ, গত তিন মৌসুমে তারা সবাই মিলে একত্রে শীর্ষ ছয়ে থেকে মৌসুম শেষ করতে পারেনি। চলতি মৌসুমে ব্রাইটন, ব্রেন্টফোর্ড ও এভারটন শীর্ষ ছয়ে আছে। মৌসুমে এখনো অনেক পথ বাকি থাকলেও লিগের শীর্ষস্থানগুলোর লড়াই অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত। এটি ফুটবল ভক্তদের জন্য অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। বিবিসি
