ব্যাটিংয়ের স্বর্গে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েও শেষ রক্ষা হলো না ইংল্যান্ডের। অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের রেকর্ড গড়া দ্বিশতকের পরও ৪২৯ রান তুলেও হার এড়াতে পারেনি দলটি। পাভান রাত্নায়াকের সেঞ্চুরি, আভিশকা ফার্নান্দোর ৯৭ রান, দাসুন শানাকার বিধ্বংসী ব্যাটিং আর জানিথ লিয়ানাগের শেষ মুহূর্তের ছক্কায় অবিশ্বাস্য জয় তুলে নিয়েছে শ্রীলঙ্কা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২ উইকেটে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা। এক বল বাকি থাকতে ৪৩০ রান তুলে জয় নিশ্চিত করে তারা। ওয়ানডে ক্রিকেটের ৫৫ বছরের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড। ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪৩৫ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে জিতে শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা।
ম্যাচে দুই দল মিলে করেছে ৮৫৯ রান, ওয়ানডের এক ম্যাচে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ ক্ষেত্রেও শীর্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়ার সেই ম্যাচের ৮৭২ রান।
জয়ের জন্য শেষ ওভারে শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন ছিল ৮ রান, হাতে ৪ উইকেট। প্রথম তিন বলে দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে তারা। চতুর্থ বলে আসিথা ফার্নান্দো এক রান নিয়ে লিয়ানাগেকে স্ট্রাইক দেন। এরপর পঞ্চম বলে লং-অফ দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে দলকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন লিয়ানাগে। তাঁর ২৭ বলে অপরাজিত ৬১ রানের ইনিংসেই শেষ হয় ইংল্যান্ডের লড়াই।
শ্রীলঙ্কার হয়ে ওপেনার আভিশকা ফার্নান্দো ৮৩ বলে ১১ চার ও ২ ছক্কায় ৯৭ রান করে জয়ের ভিত গড়ে দেন। চার নম্বরে নেমে পাভান রাত্নায়াকে ১০৬ বলে ১৫ চার ও ৩ ছক্কায় করেন ১৩০ রান। অভিজ্ঞ দাসুন শানাকা ৫০ বলে ৮ ছক্কা ও ৬ চারে ৯৭ রান করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। রাত্নায়াকে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন।
ইংল্যান্ডের হয়ে ব্রুকের ১১৬ বলে ২০২ রানের ইনিংসটি শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের কারণ হয়ে থাকল না, বরং ওয়ানডেতে দ্বিশতক করেও হারের প্রথম নজির হয়ে রইল। ২১ চার ও ১০ ছক্কায় সাজানো তাঁর ইনিংসে দ্রুততম দ্বিশতকের রেকর্ডও গড়েন তিনি। মাত্র ১১৪ বলে দ্বিশতক পূর্ণ করেন ব্রুক, ভেঙে দেন গত মাসে শুবমান গিলের ১১৭ বলে দ্বিশতকের রেকর্ড।
শ্রীলঙ্কার শুরুটা অবশ্য ছিল বিপর্যয়কর। ২৪ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে তারা। চতুর্থ ওভারে কামিন্দু মেন্ডিস ১৮ রান করে ফেরেন, পরের ওভারে রান আউট হন অধিনায়ক কুসাল মেন্ডিস, কোনো রান না করেই। এরপর আভিশকা ও রাত্নায়াকে ১৩৭ বলে ১৬৬ রানের জুটি গড়ে দলকে লড়াইয়ে ফেরান। সেঞ্চুরির কাছাকাছি গিয়ে জেমি ওভারটনের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ফেরেন আভিশকা।
রাত্নায়াকে ও শানাকার জুটিতে দ্রুত এগোতে থাকে শ্রীলঙ্কা। ৮৭ বলে দ্বিতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন রাত্নায়াকে। স্যাম কারানের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে ১০৬ বলে ১৩০ রান করেন তিনি। তাঁদের জুটিতে আসে ১৩৩ রান। এরপর শানাকা ঝড় তোলেন। কারানের এক ওভারে তিনটি ছক্কা মেরে ৯৬ রানে পৌঁছান তিনি। পরের ওভারে লিয়াম ডসনের বলে লং-অনে ধরা পড়েন শানাকা। তাঁর ৫০ বলে ৯৭ রানের ইনিংসে ছিল ৮ ছক্কা ও ৬ চার।
তখন শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন ছিল ৩৬ বলে ৬৭ রান। লিয়ানাগে দ্রুত রান তুলে দলকে জয়ের কাছে নিয়ে যান। ৪৭তম ওভারে কারানের প্রথম তিন বলে দুটি চার ও একটি ছক্কা মারেন তিনি। ওই ওভারের শেষ বলে সাহান আরাচ্চিগে আউট হলে আবার চাপে পড়ে শ্রীলঙ্কা। ৪৯তম ওভারে মাত্র ৫ রান দিয়ে ইংল্যান্ডকে লড়াইয়ে রাখেন ওভারটন। শেষ ওভারে জশ টাংয়ের বলে দুই উইকেট পড়লেও লিয়ানাগের ছক্কায় শেষ পর্যন্ত জয় পায় শ্রীলঙ্কা।
এর আগে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডকে বড় সংগ্রহ এনে দেন টম ব্যান্টন, বেন ডাকেট, জো রুট, ব্রুক ও উইল জ্যাকস। ব্যান্টন ও ডাকেটের ৭৪ রানের উদ্বোধনী জুটিতে ভালো শুরু পায় ইংল্যান্ড। ওয়েলালাগের টানা দুই ওভারে ব্যান্টন ৫১ বলে ৫০ এবং ডাকেট ৩৯ বলে ২৯ রান করে আউট হন।
এরপর রুট ও ব্রুক ১২৭ বলে ১৫৯ রানের জুটি গড়েন। ৬৬ বলে ৬৯ রান করে বিদায় নেন রুট। শুরুতে ধীরগতিতে ব্যাট করা ব্রুক প্রথম ২৪ বলে করেছিলেন ১৩ রান। পরে কামিন্দু মেন্ডিসকে টানা দুটি ছক্কা মেরে আক্রমণ শুরু করেন তিনি। ৪২ বলে অর্ধশতক এবং ৭৫ বলে চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ব্রুক। মাত্র ৯৭ বলে দেড়শ রান ছুঁয়ে লঙ্কান বোলারদের ওপর চড়াও হন ২৭ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান।
ব্রুকের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে ইংল্যান্ডের হয়ে আগের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস বেন স্টোকসের ১৮২ রান ছাড়িয়ে যান তিনি। ১৮৫ রানে তাঁর ক্যাচ ফসকান ফিল্ডার। এরপর শেষ ওভারে লিয়ানাগের বলে ছক্কা, দুই রান ও চার মেরে দ্বিশতক পূর্ণ করেন ব্রুক। শেষ বলে তাঁর ইনিংস থামে ২০২ রানে। অন্য প্রান্তে জ্যাকস ৩০ বলে ৬৬ রান করে অপরাজিত থাকেন। তাঁদের জুটিতে মাত্র ৭৯ বলে আসে ১৮৫ রান।
ইংল্যান্ডের ইনিংসে ৫০ ওভারে ৪ উইকেটে ৪২৯ রান ওঠে। শ্রীলঙ্কার বোলারদের মধ্যে ওয়েলালাগে ৫৬ রানে ২ উইকেট নেন। আসিথা ফার্নান্দো ও জানিথ লিয়ানাগে নেন একটি করে উইকেট। তবে অন্য বোলাররা রান আটকাতে ব্যর্থ হন।
পাকিস্তানের কাছে হেরে সিরিজ শুরু করা শ্রীলঙ্কার এটি প্রথম জয়। অন্যদিকে ইংল্যান্ড দুই ম্যাচেই হেরেছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ইংল্যান্ড: ৫০ ওভারে ৪২৯/৪। টম ব্যান্টন ৫০, বেন ডাকেট ২৯, জো রুট ৬৯, হ্যারি ব্রুক ২০২, উইল জ্যাকস ৬৬॥। ওয়েলালাগে ১০-০-৫৬-২, আসিথা ফার্নান্দো ১০-১-৬৮-১, মাদুশাঙ্কা ১০-০-৮৯-০, মালিঙ্গা ১০-০-৯১-০, শানাকা ৬-০-৭৪-০, কামিন্দু মেন্ডিস ২-০-১৭-০, লিয়ানাগে ২-০-৩২-১।
শ্রীলঙ্কা: ৪৯.৫ ওভারে ৪৩০/৮। কামিন্দু মেন্ডিস ১৮, আভিশকা ফার্নান্দো ৯৭, কুসাল মেন্ডিস ০, পাভান রাত্নায়াকে ১৩০, দাসুন শানাকা ৯৭, জানিথ লিয়ানাগে ৬১॥, সাহান আরাচ্চিগে ১৩, দুনিথ ওয়েলালাগে ৮, ইশান মালিঙ্গা ০, আসিথা ফার্নান্দো ১॥ অ্যাটকিনসন ৭-০-৫৭-০, জশ টাং ৮.৫-১-৭৯-৩, ওভারটন ১০-০-৭৭-১, ডসন ১-০-৭১-১, কারান ৯-০-১০৩-২, জ্যাকস ৫-০-৪১-০।
ফল: শ্রীলঙ্কা ২ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: পাভান রাত্নায়াকে।
সানা/আপ্র/২৩/১০/২০২৬
