একটা সময় ছিল যখন চামড়াশিল্পে নারীরা কাজ করছেন, এটা অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছেন এই সময়ে নারী উদ্যোক্তারা। বর্তমানে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে দেশে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে। চাকরির এই দুর্মূল্যের বাজারে শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে অনেক নারী উদ্যোক্তা সামান্য পুঁজি নিয়ে এই শিল্পে কাজ শুরু করেছেন এবং তাদের অনেকে সফলও হয়েছেন। তাদের তৈরি ব্যাগ, জুতা ও অন্যান্য পণ্য শুধু দেশে নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছে যাচ্ছে। এমন কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা হলো তাদের কাজ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে।
বিসিকে চামড়াজাত পণ্যের মেলা চলছিল। ঢুকতেই চোখে পড়ে, মেলায় এবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নারী উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করেছেন। মেলা ঘুরে বেশ কয়েকজন নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে আলাপ হলো। তারা অত্যন্ত আত্মবিশ^াসের সঙ্গে ক্রেতাদের পণ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছেন। বেশ ভালো বিক্রিও হচ্ছিল। তাদেরই একজনের সঙ্গে কথা হয়। ‘বেনে’-এর স্বত্বাধিকারী শামীমা আক্তার কেয়া। তিনি প্রায় বারো বছর ধরে চামড়া নিয়ে কাজ করছেন। তারা মূলত চামড়ার তৈরি জুতা, ব্যাগ, বেল্ট, মানিব্যাগ ও অন্যান্য গৃহস্থালির কিছু পণ্য তৈরি করে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ফুটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করি। প্রথমে কিছুদিন চাকরি করেছি। এরপর ২০১৫ সাল থেকে এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছি। শুরুতে মানুষের অনেক কটাক্ষের শিকার হয়েছি। মানুষ মুখের ওপরও বলত, বাড়িতে পুরুষ মানুষ নাই? আপনি কেন এই জায়গায় ব্যবসা করতে আসছেন? পাওনা টাকা দিতেও লোকে ঘোরাত। সময়ের ব্যবধানে এখন অনেক কিছুই বদলে গেছে। আমার পণ্য এখন সুপরিচিত। শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরেও আমাদের পণ্য চলে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত এই শিল্পে ভূমিকা রাখার জন্য আমি বেশ কিছু সম্মাননাও পেয়েছি। আমার বাবা কাজ করতেন লেদার নিয়ে। বলতে পারেন, আমি তার স্বপ্নকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বাবার ইচ্ছা ছিল, একটা ফ্যাক্টরি করবেন। অনেক লোক সেখানে কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করবে। আমি ছোট একটা ফ্যাক্টরি করেছি। এখন সেখানে পনেরো জনের মতো লোক কাজ করছে। আশা করি, একদিন অনেক লোক কাজ করবে আমার সঙ্গে।’
কথা হয় ‘অরলেন্স লেদার’-এর স্বত্বাধিকারী শাম্মী তাহমিনার সঙ্গে। তার কারখানা হাজারীবাগের বেড়িবাঁধের ওপরে। তিনি ছিলেন কমার্সের স্টুডেন্ট। পাস করার পর একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তখন তিনি বিসিকে চামড়াজাত পণ্য তৈরির ওপর একটি ট্রেনিং করেন। ব্যস! এই কাজের প্রতি তার আগ্রহ জন্ম নেয়। প্রথমে তিনি ছোট আকারে কাজ শুরু করেন। অল্প পণ্য তৈরি করে বিক্রির চেষ্টা করেন। ভালো সাড়া পান। দিন দিন তার আগ্রহ বাড়তে তাকে। কাজের পরিমাণ বাড়তে থাকে। তিনি চাকরি ছেড়ে কাজ শুরু করেন। এখন তিনি পুরোদস্তুর একজন উদ্যোক্তা।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা তানহা আক্তার মুক্তা। তার উদ্যোগের নাম ‘ট্যাম লেদার’। ব্যবসাটা তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে করেন। নিজ বাড়িতেই তাদের কারখানা। তার স্বামী আগে চাকরি করতেন। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে বিজনেস শুরু করলে স্ত্রী মুক্তাও তাতে যোগ দেন। মুক্তা বলেন, ‘আমারও ইচ্ছা ছিল একটা কিছু করার, নিজে উপার্জন করার। পরে স্বামী কারখানা দিলে সেখানে বাইরের লোক কাজ করছে দেখে মনে হলো, আমি পাশে থাকলে ব্যবসাটা দাঁড়াবে এবং আমিও স্বাবলম্বী হব। এখন তাই হয়েছে। আমাদের বিজনেসের অর্ধেক মালিকানা আমার। একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আমি এখন অনেকটাই সফল।’
‘ডিয়ার লেদার’-এর স্বত্বাধিকারী ফরিদা ইয়াসমিন বিথী। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে তিনি চামড়াজাত পণ্য তৈরির ওপর একটি ট্রেনিং করেন। এরপর হাজারীবাগের ট্যানারির মোড়ে একটি ফ্যাক্টরি দিয়ে পণ্য তৈরি শুরু করেন।
কথা হয় ফাহমিদা তাসনিমের সঙ্গে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘কারুকর’। তিনি পড়াশোনা করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনের ওপর। এরপর জড়িয়ে যান চামড়াজাত শিল্পের সঙ্গে। এই কাজের ওপর একটি ট্রেনিং করার পরই মূলত তার আগ্রহ হয় এই শিল্পের প্রতি। প্রথমে তিনি অল্প কিছু পণ্য তৈরি করে অনলাইনে একটি পেজ খুলে বিক্রি শুরু করেন। ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়াও পান। এখন তিনি অনলাইন-অফলাইনে বিজনেস করছেন। উদ্যোক্তা হিসেবেও এখন তিনি বেশ সফল। তিনি চান তার তৈরি পণ্য শুধু দেশে নয়, বিদেশেও রপ্তানি করবেন।
শুধু ব্যাগ নিয়ে কাজ করেন ‘ফেমো লেদার’-এর ফাতেমা আক্তার। তার কারখানা হাজারীবাগে। তিনি ছিলেন পেশায় একজন আইনজীবী। বিসিকে একবার তিনি খেয়ালবশত চামড়াজাত শিল্প তৈরির ওপর একটি ট্রেনিং করেন। এরপর তিনি শখের বশে কাজ করতে করতে এমনভাবে জড়িয়ে গেছেন, এখন তিনি বেশ সফল একজন উদ্যোক্তা। তিনি খুচরা বিক্রি তেমন করেন না। দু-একটি মেলায় অংশ নেন প্রচারের জন্য। এ ছাড়া তিনি তার তৈরি ব্যাগ মূলত পাইকারি বিক্রি করে থাকেন।
যে ক’জন নারীর সঙ্গে কথা হলো তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত। কেউ কেউ অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েও সেটি ছেড়ে চামড়াশিল্পে উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। এটি বেশ চ্যালেঞ্জের জেনেও তারা নিজের ইচ্ছায় এই খাতে কাজ করতে এসেছেন এবং সফলও হয়েছেন।
