সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। নেই দৃশ্যমান কোনো খাল, ছড়া কিংবা পানির প্রবাহ। অথচ নতুন কালভার্ট নির্মাণের জন্য কেটে ফেলা হচ্ছে বিটুমিনের সড়ক, খোঁড়া হচ্ছে মাটি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেখানে পানিপ্রবাহের দৃশ্যমান কোনো পথ নেই, সেখানে কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজন কতটা? তার ওপর কালভার্টের মুখে পানি পৌঁছাতে নতুন করে খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলি জমি। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কার পাশাপাশি জীবিকা হারানোর উদ্বেগও তৈরি হয়েছে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়া বাজার পর্যন্ত সীমান্ত সড়ক সংস্কার প্রকল্পে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন প্রায় পঁাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণে ব্যয় হচ্ছে ৪২ কোটি ৯৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৩১ টাকা। প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি সেতু ও ১০টি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে তিনটি কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয়দের আপত্তির মুখে একটি থেকে সরে আসে কর্তৃপক্ষ। বাকি দুটি কালভার্টের নির্মাণকাজ চলছে। এসব কালভার্ট নির্মাণে অন্তত ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী। তবে পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশনের যুক্তি দেখিয়ে কালভার্ট নির্মাণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এলজিইডি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারের আগে প্রয়োজনীয়তা যাচাই ও এলাকাবাসীর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করেই কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অথচ পাহাড়ি ছড়ার পানি নিষ্কাশনের জন্য সড়কটির পাশেই আগে থেকে কালভার্ট রয়েছে। নতুন কালভার্টের পানি চলাচলের পথ তৈরি করতে ফসলি জমির ওপর দিয়ে খাল খনন করা হলে কৃষিজমি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক প্রশস্ত করতে গিয়ে রেকর্ডভুক্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি, বিভিন্ন মিশন, মাদ্রাসা ও চার্চের জমিও সড়কের আওতায় চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়ামুখী সড়কের বিভিন্ন অংশে সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। রাজাই গ্রামের অংশে সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি স্থানে বিটুমিনের সড়ক কেটে বড় গর্ত করা হয়েছে। কোথাও কালভার্ট নির্মাণের জন্য মাটি খোঁড়া হয়েছে, আবার কোথাও ভেঙে ফেলা হয়েছে সড়কের একাংশ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, কালভার্টের সামনে ও পেছনে খাল খনন করা হবে, যাতে এর নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে পারে।
চানপুর বাজারসংলগ্ন রাজাই গ্রামের বাসিন্দা দানিয়াল ম্রু বলেন, যেখানে নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে আগে কোনো ছড়া বা খাল ছিল না। এখন সেখানে কালভার্ট নির্মাণের পাশাপাশি খাল খনন করা হবে বলে জানতে পেরেছেন তারা। কিন্তু যে জায়গা দিয়ে খাল খননের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেটি তাদের ফসলি জমি। জমির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে এবং নিয়মিত খাজনাও পরিশোধ করেন। এই জমিতে চাষাবাদ করেই তাদের জীবিকা চলে। ফসলি জমি কেটে খাল তৈরি করা হলে তারা চাষাবাদ থেকে বঞ্চিত হবেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পরিবেশকর্মী এন্ডো সলোমার বলেন, প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করে কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সড়কটি প্রশস্ত করা হলে স্থানীয় অনেকের রেকর্ডভুক্ত জমি সড়কের আওতায় চলে যেতে পারে। শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিই নয়, বিভিন্ন মিশন, মাদ্রাসা ও চার্চের জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার অভিযোগ, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি সড়ক সম্প্রসারণের কাজে ব্যবহার করা হলেও অধিগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে এলজিইডির তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, সড়কের জন্য ম্যাপে ৪৮ ফুট জায়গা উল্লেখ রয়েছে। সড়কটি ২৬ ফুট প্রশস্ত করা হবে। এরপরও এলজিইডির জায়গা থাকবে। যারা ব্যক্তিগত জমি সড়কের আওতায় পড়ার কথা বলছেন, তাদের অধিকাংশই বিষয়টি না জেনে অভিযোগ করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জাহিদুল ইসলাম বলেন, সড়কটিতে নতুন করে তিনটি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। স্থানীয়দের আপত্তির পর একটি বাদ দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটি নির্মাণ করা হবে। বর্ষায় আকস্মিক পাহাড়ি ঢল নামলে পানি সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ সময় পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকলে পানির চাপে সড়ক ভেঙে যেতে পারে। ভবিষ্যতে পানি চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা এবং সড়ক সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করেই কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নতুন কালভার্টের সঙ্গে পানিপ্রবাহের পথ তৈরির জন্য ফসলি জমি খনন কতটা যৌক্তিক, তা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কিনা। প্রায় ৪৩ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্পে নির্মাণকাজের পরিকল্পনা, জমির ব্যবহার ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে এই প্রশ্নের মীমাংসা চান তারা।
