Published on
:
3 min read
ঋতভাষ চট্টোপাধ্যায়
প্রতি বছর পুজোর আগে ঘর গোছানোর দায়িত্ব ছিল মেয়ের। মহালয়ার আগেই বইয়ের টেবিল-তাকের ঝুল, আলমারির উপরে লেপ্টে থাকা ধুলো সাফ করা হয়ে যেত — যাতে দেওয়ালের পলেস্তরা খসে-পড়া ঘরটা পুজোর আগে একটু হলেও ঝকঝকে হয়। ঘরটা দেখেও যাতে পুজো-পুজো মনে হয়। ধুলো ঝাড়া হয়ে গেলে শুরু হতো জামাকাপড় গোছানো। নিজেরটা তো বটেই, মা-বাবার জামাকাপড়ও আলাদা করে আলমারিতে সাজিয়ে রাখত।
এ বার সেই ঘরদোর আর ঝাড়পোঁছ হয়নি। বাড়িতে ঢোকার মুখে একখানা সাইকেল পাংচার হয়ে পড়ে রয়েছে। সেটির সামনের ঝুড়িতেও যত সব অপ্রয়োজনীয় জিনিসের স্তূপ। ঘরও অবিন্যস্ত। জামাকাপড় চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। গোছাবে কে! যে করত, সে তো এ বার ঘরেই নেই। তাই উৎসবের ছোঁয়াও লাগেনি সিনহা পরিবারে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো কোনও রকমে জেগে রয়েছে বাড়িটা। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামতেই যে বাড়িতে অন্ধকার নামে। পাড়ার পুজোর আলোর রোশনাই যে অন্ধকারকে আরও গাঢ়, আরও গভীর করে দেয়। চোখের জল মুছতে মুছতে ধরা গলায় আনমনে বৃদ্ধ মায়ের স্বগতোক্তি, ‘মেয়ে যে দিন ফিরবে, সে দিন আমাদের পুজো হবে!’
গত সাত মাস ধরে সিউড়ির ডাঙাল পাড়ার এই বাড়িতে এ ভাবেই গুমরে মরছেন ‘নিখোঁজ’ মেয়ের বৃদ্ধ বাবা-মা। মেয়ে কোথায় চলে গিয়েছে, তাঁরা জানেন না! থানা-পুলিশ, লালবাজার-সিআইডি... স-অ-অ-অ-ব হয়েছে। কিন্তু বছর চব্বিশের অমৃতার খোঁজ মেলেনি। প্রায় রোজ সকালে নিয়ম করেই গলায় একখানা প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েন বাবা অর্ধেন্দু। রোদ-ঝড়-জল-বৃষ্টির মধ্যেও জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়ান মেয়ের খোঁজে। কখনও বীরভূম থেকে সোজা কলকাতা। কখনও আবার আসানসোল। কখনও একা। কখনও সঙ্গী হন অসুস্থ স্ত্রী সুপ্রিয়া। তবে প্রতিবারই খালি হাতে ফিরতে হয়। দিনের শেষে অন্ধকারে খাঁ খাঁ করা ঘরটায় ঢুকলে আবার সেই শূন্যতা গিলে খায় ওদের।
খাটের পাশের দেওয়ালে অমৃতার শৈশবের দু’টি ছবি টাঙানো। একটি ছবিতে মেয়ে চেয়ারে গুটিসুটি মেরে বসে রয়েছে। অন্যটি ছোট্ট অমৃতা মশারির জাল তুলে বেরিয়ে আসার ছবি। চাঁদের হাসি লেগে সেই ফুটফুটে মুখে। তা দেখেই দুঃখ ঘোচানোর বৃথা চেষ্টা করতে হয় বৃদ্ধ দস্পতিকে। কর্মসূত্রে বিহারের বেগুসরাইয়ে থাকাকালীন বাবা অর্ধেন্দু রিল ক্যামেরায় এই দু’টো ছবি তুলেছিলেন। নিষ্পলক তাকিয়ে বলেন, ‘মেয়ের এই প্রাণবন্ত হাসিটাই আর একবার দেখে যেতে চাই আমরা। আর কিচ্ছু চাওয়া-পাওয়া নেই এই বুড়ো-বুড়ির!’
গত ১৩ মার্চ মেয়েকে শেষবার দেখেছিলেন অর্ধেন্দু-সুপ্রিয়া। মা ঘরে পুজো করছিলেন। সেই ফাঁকে হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে দরজায় খিল দিয়ে বেরিয়ে যান অমৃতা। তার পর থেকে আর খোঁজ নেই। তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ জানতে পেরেছে, সিউড়ি থেকে মল্লারপুরগামী বাসে উঠেছিলেন তরুণী। কিন্তু কখন তিনি বাস থেকে নেমে গিয়েছেন, কোথায় গিয়েছেন, তা আর কেউ জানেন না। তদন্তও কার্যত সেখানেই থেমে রয়েছে বলে খবর পুলিশ সূত্রে। আর নতুন কোনও সূত্র মিলেছে বলেও জানা যায়নি। পঁয়ষট্টি ছুঁই ছুঁই অর্ধেন্দুও শুধু পুলিশি তদন্তের ভরসায় থাকেননি। মেয়ের নামধাম-ছবি, দেহের গড়নের বর্ণনা সংবলিত প্ল্যাকার্ড গলায় ঝুলিয়ে গোটা বীরভূম চষে ফেলেছেন। পথচলতি মানুষকে ধরে ধরে জিজ্ঞেস করেছেন। যদি কেউ কোথাও কখনও অমৃতা বা তাঁর মতো দেখতে কাউকে দেখে থাকেন! কিন্তু কেউই মেয়ের খোঁজ দিতে পারেননি।
উপায় না দেখে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কথাও ভেবেছিলেন অর্ধেন্দু। খবরে শুনেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী রামপুরহাটে আসবেন। সেই মতো স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সেখানেও চলে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ। রোদের মধ্যে রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় গেলে হাত নেড়ে, প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করবেন। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে সে দিন সাক্ষাৎ হয়নি। পরে অবশ্য এক দিন কলকাতায় জনতার দরবারে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় বৃদ্ধ দম্পতির। মুখ্যমন্ত্রীও তাঁদের আশ্বাস দিয়েছেন। আপাতত সেই ভরসায় দিন কাটে দু’জনের।
দেখতে দেখতে পুজোও চলে এসেছে। কিন্তু এ বছর সিনহা পরিবারে পুজোর আগমনী নেই। অর্ধেন্দু-সুপ্রিয়াও নৈঃশব্দ্যের বৃত্তে ঢুকে পড়েছেন। একের পর এক প্রশ্ন শুনতে শুনতে মা স্মৃতির ছোট ছোট মুহূর্ত তুলে ধরলেন, ‘ও রান্না করতেও ভালোবাসে। প্রতিবার পুজোর সময়ে আমি আর ও রান্না করতাম। তার পরে তিন জনে একসঙ্গে বসে খেতাম। আমাদের পুজোর সব আনন্দ তো ওকে ঘিরেই ছিল।’
পুজোর অতীতচারণে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বাবাও। সুপ্রিয়া একটু বিরতি নিতেই অর্ধেন্দু বলতে শুরু করেন, ‘মেয়ে যখন ক্লাস থ্রি না ফোরে পড়ত, অষ্টমীর দিন বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। তখন থেকেই পুজোয় সকাল-সন্ধে ঠাকুর দেখতে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছিলাম। হয়তো কোনও এক দিন রাতের দিকে একটু বেরোতাম তিন জনে। কাছেপিঠের কয়েকটা ঠাকুর দেখে আবার ফিরে আসতাম। আমাদের বাড়ির কাছেই একটা পুজো হয়। কত বলতাম, যা, ওখানে যা। কিন্তু ও যেতই না। ঘরে থাকত মায়ের সঙ্গে। মা বেরোলে তবেই বেরোবে। তখন হয়তো ওই মণ্ডপে গিয়ে একটু বসত। গত বার তো ঘর থেকেই বেরোয়নি।’
অর্ধেন্দুর কথা শুনতে শুনতে হাতের চেটোয় চোখ মুছছিলেন সুপ্রিয়া। বাড়ির অদূরে আনন্দপুরের সেই পুজোমণ্ডপ এ বারও সেজে উঠেছে। কত আনন্দ-আয়োজন! সুপ্রিয়ারও ভীষণ ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে প্যান্ডেলে গিয়ে একটু বসতে। কিন্তু গত কয়েক মাসে সব ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। ঢাকের আওয়াজ এখন মায়ের কানে বিষমাখানো তিরের ফলার মতো বিঁধছে। তাঁর চোখ ঝলসে দিচ্ছে উৎসবের আলো।
অদ্ভুত সমাপতন কি না, জানা নেই। তবে সেই মুহূর্তে মা-বাবা দু’জনেই তাকিয়ে ছিলেন সামনেই স্টাডি টেবলের উপরে রাখা মেয়ের সাধের লাল পিঠব্যাগের দিকে। যে ব্যাগে ইংরেজি অক্ষরে ‘অমৃতা সিনহা’ লেখা। কিংবা হয়তো ঠিক তার পিছনের আলনার দিকে। মা-মেয়ের পুরোনো পোশাকে ঠাসা যে আলনা দাঁড়িয়ে আছে এক ধ্বংসস্তূপের অভিজ্ঞান হয়ে। হয়তো সে দিকে তাকিয়ে জীবনের ‘ধাঁধা’র সমাধানে ব্যস্ত বৃদ্ধ দম্পতি — আনন্দপুরের পুজোমণ্ডপ থেকে অনতিদূরে, যেখানে বিষাদই এখন নিত্যদিনের সুর।
