কারাগারে না পাঠিয়ে আদালতের তত্ত্বাবধানে শর্তসাপেক্ষে সংশোধনের সুযোগ দিয়ে চট্টগ্রামে ১ হাজার ৫৫১ জন লঘু অপরাধীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে প্রবেশন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় অপরাধীদের তাদের পরিবার ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত রেখে সংশোধনের পাশাপাশি দেশের অতিরিক্ত জনাকীর্ণ কারাগারগুলোর ওপর চাপ কমানোরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০১৬ সালে চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে প্রবেশন কার্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৫১ জন অপরাধী এ সুযোগ পেয়েছেন। প্রবেশন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৯৯২ জন প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন, যা দেশের একক কোনো প্রবেশন কার্যালয়ের অধীনে সর্বোচ্চ সংখ্যা। এ ছাড়া শর্ত পূরণ করে ৫৫৯ জন তাদের দ- থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রবেশন এমন একটি আইনি ব্যবস্থা, যেখানে আদালত কোনো অপরাধীর কারাদ- স্থগিত রেখে নির্দিষ্ট শর্তে তাকে পরিবারের সঙ্গে বসবাস ও সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ দেন। এ সময় একজন প্রবেশন কর্মকর্তা তার আচরণ ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন। এ ব্যবস্থায় জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার একটি উদাহরণ আবদুল্লাহ (প্রকৃত নাম নয়)। ২০২৩ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তিনি। ভালো ফল ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও একপর্যায়ে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন আবদুল্লাহ। পরে তৎকালীন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) তাকে গ্রেপ্তার করে এবং তাকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তবে তার জীবনের গতিপথ বদলে যায় চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এর একটি আদেশে। আদালত তাকে আটক রাখার পরিবর্তে একজন প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রাখার নির্দেশ দেন। আবদুল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেন প্রবেশন কর্মকর্তা মনজুর মোরশেদ। নিজের ভুল উপলব্ধি করা এবং আচরণ পরিবর্তনে তাকে সহায়তা করা হয়। একপর্যায়ে আবদুল্লাহ আগের অভ্যাস ত্যাগ করে নতুনভাবে জীবন গড়ার উদ্যোগ নেন। পরে আদালত ও প্রবেশন কার্যালয় তার শর্ত পূরণের বিষয়টি যাচাই করে তাকে দ- থেকে অব্যাহতির যোগ্য বলে বিবেচনা করে। শিক্ষাজীবনে ফিরে এসে আবদুল্লাহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে ওঠার এ যাত্রা প্রমাণ করে, যথাযথ পুনর্বাসনের সুযোগ পেলে তরুণ অপরাধীরাও নতুন জীবন শুরু করতে পারে।
চট্টগ্রাম সিএমএম আদালত ও এর অধীনস্থ আদালতগুলো সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কার্যালয়ের মাধ্যমে যোগ্য আসামি ও দ-প্রাপ্ত ব্যক্তিদের শর্তসাপেক্ষ তত্ত্বাবধানে রাখছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ ব্যবস্থা অপরাধীদের সমাজে পুনঃএকীভূত হতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমায় এবং লঘু অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কারাগারে গুরুতর অপরাধীদের সংস্পর্শে এসে আরও বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি হ্রাস করে। প্রবেশনপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদালতের দেওয়া শর্ত পূরণ করতে হয়। এসব শর্তের মধ্যে বই পড়া, গাছ লাগানো, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদাচরণ, মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, মাদকবিরোধী কর্মকা-ে অংশগ্রহণ, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা এবং হাসপাতালে মাদক পরীক্ষা করানোর মতো বিষয় থাকতে পারে। ১৯৬০ সালের অপরাধী প্রবেশন অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী, মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-নীয় নয়Ñ এমন অপরাধের ক্ষেত্রে যোগ্য পুরুষ অপরাধীরা প্রবেশনের সুযোগ পেতে পারেন। মৃত্যুদ-যোগ্য অপরাধ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে নারী অপরাধীরাও এ সুযোগের আওতায় আসতে পারেন। অন্যদিকে, শিশু আইন, ২০১৩-এর বিধান অনুযায়ী, আইনের শর্তসাপেক্ষে অপরাধের ধরন নির্বিশেষে শিশু অপরাধীদের প্রবেশনে রাখার সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের কারাগারগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার বন্দি রয়েছেন, যেখানে ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৬ হাজার। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারেই প্রায় ৬ হাজার বন্দি রয়েছেন, যা কারাগারটির নির্ধারিত ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি।