বাংলা গানের পরিচিত ধারায় নতুনত্ব এনে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন হাবিব ওয়াহিদ। লোকগীতির মায়াবী সুরের সঙ্গে আধুনিক ইলেকট্রনিক বিট, সিন্থেসাইজার ও পাশ্চাত্য সংগীতের উপাদান মিলিয়ে তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র সংগীতভাষা। গায়ক, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে তাঁর এই যাত্রা বাংলা সংগীতের আধুনিক ধারাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। আজ ১৫ অক্টোবর, এই সংগীতশিল্পীর জন্মদিন।
সংগীতের আবহে বেড়ে ওঠা:
১৯৭৯ সালের ১৫ অক্টোবর জন্ম হাবিব ওয়াহিদের। তাঁর বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদ বাংলাদেশের জনপ্রিয় পপসংগীতশিল্পীদের একজন। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের পরিবেশে বেড়ে ওঠা হাবিব শুধু গান গাওয়ায় নয়, সংগীত তৈরির কারিগরি দিকেও আগ্রহী ছিলেন। সেই আগ্রহ থেকেই ১৯৯৯ সালে লন্ডনের স্কুল অব অডিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। শব্দ, সুর ও প্রযুক্তির এই সমন্বয় পরবর্তী সময়ে তাঁর সংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
‘কৃষ্ণ’ অ্যালবামে বদলের হাওয়া:
২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবাম হাবিবের সংগীতজীবনে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এনে দেয়। লোকগানের চেনা সুরের সঙ্গে আধুনিক বিট ও ইলেকট্রনিক সংগীতের মেলবন্ধন শ্রোতাদের সামনে হাজির করে ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা। হাসন রাজা ও শাহ আবদুল করিমের মতো লোকসংগীতের শিল্পীদের গান নতুন সংগীতায়োজনে তরুণ প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে এই নতুন ধারাকে ঘিরে সমালোচনাও ছিল। লোকগানের প্রচলিত পরিবেশনায় পরিবর্তন আনার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হলেও হাবিব নিজের সংগীতভাবনায় অটল ছিলেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর এই ধারা শ্রোতাদের মধ্যে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে।
নতুন কণ্ঠকে পরিচিত করার ভূমিকা:
হাবিবের সংগীতায়োজনের মধ্য দিয়ে একাধিক শিল্পী শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। ন্যান্সিসহ বিভিন্ন শিল্পীর জনপ্রিয় গানে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। নতুন কণ্ঠকে সামনে নিয়ে আসা এবং তাঁদের জন্য স্বতন্ত্র সংগীতপরিসর তৈরি করাও তাঁর কাজের উল্লেখযোগ্য দিক।
বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল থেকে চলচ্চিত্র:
অ্যালবামের বাইরেও বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল ও চলচ্চিত্রের সংগীতে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন হাবিব। আধুনিক সাউন্ড প্রোডাকশন ও পেশাদার সংগীতায়োজনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের সংগীতকেও গুরুত্ববহ করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান রয়েছে।
২০১১ সালে ‘প্রজাপতি’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এই স্বীকৃতি চলচ্চিত্রের সংগীতে তাঁর কাজের গুরুত্ব আরও প্রতিষ্ঠিত করে।
ফুয়াদের সঙ্গে সুস্থ প্রতিযোগিতা:
সংগীতশিল্পী ফুয়াদ আল মুক্তাদিরের সঙ্গে হাবিবের বন্ধুত্ব ও সুস্থ প্রতিযোগিতার গল্পও আলোচিত। ফুয়াদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, দুজন একে অন্যের গানের মাস্টার কপি শুনতেন এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের কাজের মান আরও উন্নত করার চেষ্টা করতেন। প্রযুক্তি ও সংগীত প্রযোজনার নানা বিষয়েও তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন।
বাংলা সংগীতে স্বতন্ত্র অবস্থান:
দুই দশকের বেশি সময় ধরে হাবিব ওয়াহিদ বাংলা সংগীতে সক্রিয়। লোকজ সুরকে আধুনিক আঙ্গিকে উপস্থাপন, নতুন শিল্পীদের পরিচিতি এবং সংগীত প্রযোজনায় প্রযুক্তির ব্যবহার—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর কাজ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
জন্মদিনে হাবিবকে ফিরে দেখা মানে শুধু একজন জনপ্রিয় শিল্পীকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলা গানের বদলে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুন করে উপলব্ধি করা। নিজস্ব সংগীতভাষা আর নিরীক্ষাধর্মী আয়োজনের মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের কাছে আজও স্বতন্ত্র হাবিব ওয়াহিদ।
