জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার বাড্ডায় প্রাইভেটকার চালক এমদাদুল হক হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
তবে আসামির ওই তালিকা, এমনকি খোদ মামলার বাদীকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এমদাদের পরিবার। তাদের ভাষ্য, পরিবারের কেউ না হয়েও এই মামলার মাধ্যমে এলাকার কিছু লোককে ‘ফাঁসিয়ে দিয়েছেন’ মামলার বাদী সাইফুল ইসলাম।
মামলার বাদী সাইফুল নিজেকে এমদাদের চাচাত ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। তবে সাইফুলের মা মোসাম্মৎ হাসিনা বেগম বলেছেন, মামলা হওয়ার আগে সাইফুলকে তারা চিনতেন না।
মামলার এজাহারে শেখ হাসিনাসহ ১২১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ১০০/২০০ জনকে আসামি করেছিলেন সাইফুল।
তদন্ত শেষে শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছেন মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের অপারেশন শাখার (বারিধারা) পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। এজাহারে আসামির তালিকায় নাম থাকা ৭৭ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
এমদাদ ও সাইফুল দুজনেরই বাড়ি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানার ধাওয়া গ্রামে। তবে মামলা করার আগে এমদাদের পরিবারের সঙ্গে সাইফুল কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি বলে হাসিনা বেগমের ভাষ্য।
তিনি বলেন, “আমরা কোনো মামলা করিনি। পরে জানতে পারছি মামলা করছে পাশের এলাকার একজন। তাকে চিনতাম না। মামলা করার আগে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। মামলার পর করে যোগাযোগ করছে।”
সাইফুলের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে এমদাদের মা হাসিনা বেগম বলেন, “মামলায় এলাকার কিছু লোককে ফাঁসায় দিছে। তারা থাকে গ্রামে। আর মামলা করে ঢাকায়। তারা ঘটনার সময়ও (আন্দোলনের সময়) এলাকায় ছিল। ইচ্ছা করে লোকগুলোকে ফাঁসায়ে দিছে। তার সাথে হয়ত শত্রুতা ছিল, এজন্য এমন করছে।”
এ বিষয়ে কথা বলদে সাইফুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে, তিনি ‘সাক্ষাতে মামলার বিষয়ে কথা বলবেন’ জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
কী ঘটেছিল, কারা আসামি
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় গুলিতে নিহত হন এমদাদ। ওই ঘটনায় ৯ সেপ্টেম্বর মামলা করেন সাইফুল। তদন্ত শেষে অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অভিযোগপত্র আদালতে জমা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের আসামি করা হয়েছে। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা পেয়েছে। এরপরের বিষয় আদালত দেখবেন।”
শেখ হাসিনা ছাড়া অভিযোগপত্রের আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী সরকারের সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আসাদুজ্জামান নূর, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, জুনাইদ আহমেদ পলক।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামকেও আসামি করা হয়।
আসামির তালিকায় আরও আছেন সাবেক এমপি মাইনুল হোসেন খান নিখিল, মোহাম্মদ ওয়াকিল উদ্দিন, হেদায়ত উল্লাহ রণ। এছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের নামও আসামির তালিকায় রয়েছে।
অন্যদিকে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম রহমতউল্যাহ, পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, পুলিশের এসবির সাবেক মনিরুল ইসলাম, ওয়াসিকুর রহমান বাবু, কামাল উদ্দীন শাহীনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে সালমান এফ রহমান, পলক, আতিকুল ইসলাম, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন কারাগারে রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, “শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাদ্দাম হোসেনসহ কয়েকজন নির্দেশদাতা আসামি। তারা ঘটনাস্থল বাড্ডার এ এম জেড হাসপাতালের একটু সামনে রাস্তায় উপস্থিত না থাকলেও তাদের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি বর্ষণ করা হয়। এমদাদের কপালে গুলি লেগে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায় এবং সে মারা যায়।”
‘যে মামলা করছে, তার কারণে আমার ছেলেটা মরেও গালি শুনছে’
মোসাম্মৎ হাসিনা বেগমের দুই ছেলে এক মেয়ের মধ্যে এমদাদ ছিলেন সবার ছোট। ঢাকায় প্রাইভেটকার চালাতেন তিনি। মারা যাওয়ার আগের দিন রাতেও মায়ের সঙ্গে কথা হয় তার। পরদিন সকালে ছেলের মৃত্যুর খবর পান হাসিনা বেগম।
তিনি বলেন, “মামলা করে কি করব। ছেলে কি ফিরে আসবে? আর মারছে তো প্রশাসন। এতোগুল মানুষ মিলে মারছে? আর কার নির্দেশে খুন হয়ছে, হাসিনাকে পাইলে তো বিচার হবে। আমার বুক খালি করছে। এরকম কত মায়ের বুক খালি হয়েছে। আল্লাহর কাছে তো বিচার দিয়ে রেখেছি।”
তিনি বলেন, “ছেলেটা মারা যাওয়ার আগের দিন রাত ১০টায় ফোন দিয়ে কথা বললো। পরদিন সাড়ে ৯টার দিকে মৃত্যুর খবর পাই। সন্তান হারানো যে কত বেদনার, যে মা হারায় সেই বোঝে। যে মামলা করছে, তার কারণে আমার ছেলেটা মরেও গালি শুনছে। তারা এসে বলছে, আপনার ছেলের কারণে আমরা শুধু শুধু ঝামেলায় পড়েছি। আমি চাই, কোনো মা যেন আমার মত কষ্ট না পায়।”
