কালবেলা · general
রণিত স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান মেলায় শিক্ষার্থীদের ৯০ প্রকল্প
১১/১০/২০২৬

পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেদের কল্পনা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছে শিক্ষার্থীরা। কেউ তৈরি করেছে সৌরজগতের মডেল, কেউ সড়ক ও সেতুর কাঠামো, আবার কেউ দেখিয়েছে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের গঠন, পানি বিশুদ্ধকরণ ও পরিবেশদূষণ কমানোর উপায়।
বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্পের পাশাপাশি মেলায় ছিল হাতে আঁকা দেয়ালচিত্র, পোশাকের নকশা এবং শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন খাবারের আয়োজন। এমন নানা উদ্যোগের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে রণিত স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান মেলা-২০২৬।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীর আজিমপুর এস্টেট জনকল্যাণ সমিতি মিলনায়তনে এ মেলার আয়োজন করা হয়। ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বুদ্ধিদীপ্ত আগামী’ স্লোগানে আয়োজিত মেলার প্রতিপাদ্য ছিল ‘অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে গড়ি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’। মেলার আয়োজন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আরএসসি সায়েন্স ক্লাব।
মেলায় প্রথম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কথা জানানো হলেও প্রকল্প প্রদর্শনীতে প্রিপারেটরি, প্রাইমারি, জুনিয়র ও সেকেন্ডারি, এই ৪টি বিভাগে প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থী ৯০টি প্রকল্প নিয়ে অংশ নেয়।
আয়োজকদের তথ্যমতে, পুরো আয়োজনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল প্রায় এক হাজার। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে অতিথিদের আগমন ও প্রকল্প প্রদর্শনী। এরপর বেলা ১টায় পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেলার বিভিন্ন স্টলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের তৈরি প্রকল্প দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরছে। রঙিন কাগজ, কার্ডবোর্ড, ছোট বল ও সহজলভ্য নানা উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে সৌরজগতের মডেল। কোথাও সড়ক, সেতু ও যানবাহনের কাঠামো, কোথাও গাছপালা, পুকুর, বাড়িঘর ও গৃহপালিত পশু দিয়ে সাজানো হয়েছে গ্রামীণ পরিবেশের প্রতিচ্ছবি। একটি প্রকল্পে বায়োস্কোপের মাধ্যমে স্থিরচিত্র থেকে চলমান ছবির ধারণাও তুলে ধরা হয়েছে।
মেলায় মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্রের গঠনভিত্তিক প্রকল্পও স্থান পায়। এর মধ্যে ছিল শ্বসনতন্ত্র, প্রজননতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, পেশিতন্ত্র, কঙ্কালতন্ত্র ও রেচনতন্ত্র। পাশাপাশি পানি বিশুদ্ধকরণ, পানিচক্র, বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনা, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, ডিএনএ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানবমস্তিষ্কের তুলনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রকল্প তৈরি করে শিক্ষার্থীরা। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে পাঠ্যবইয়ে শেখা বিষয়গুলো হাতে-কলমে উপস্থাপনের চেষ্টা করে তারা।
মেলায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও কাজের ধরনেও ছিল বৈচিত্র্য। কেউ শিক্ষকের নির্দেশনা ও সহযোগিতায়, কেউ মুঠোফোনে বিভিন্ন নমুনা ও তৈরির পদ্ধতি দেখে, আবার কেউ বাবা-মায়ের সহায়তায় তৈরি করেছে নিজেদের প্রকল্প।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী খাদিজা মহিউদ্দিন নিজের হাতে আঁকা বিভিন্ন দেয়ালচিত্র নিয়ে মেলায় অংশ নেয়। ছবি আঁকার প্রতি ভালো লাগা থেকেই এ দক্ষতা অর্জন করেছে সে। খাদিজা বলে, ‘ছোটবেলা থেকে একা একা আঁকতে আঁকতেই এভাবে আঁকা শিখেছি। আমার আঁকতে ভালো লাগে।’
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসির শেহজাদ তৈরি করেছে সড়ক ও সেতুর কাঠামো। এ কাজে বাবা ও শিক্ষকের সহযোগিতা পেয়েছে সে। ইয়াসির বলে, ‘আমি সড়ক ও সেতুর কাঠামো বানিয়েছি। এটা বানাতে আমাকে সাহায্য করেছেন আমার বাবা ও স্যার।’
বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্পের পাশাপাশি মেলায় শিক্ষার্থীদের হাতে তৈরি পিঠা, পুডিংসহ বিভিন্ন খাবার এবং নানা নকশার পোশাক প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া ছিল মোট ১৫টি স্টল। দর্শনার্থীরা প্রকল্প পরিদর্শনের পাশাপাশি খাবার ও অন্যান্য স্টল ঘুরে দেখার সুযোগ পান। সব মিলিয়ে বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে শিল্পকলা, পোশাকের নকশা ও ব্যবহারিক দক্ষতা প্রদর্শনেরও ক্ষেত্র হয়ে ওঠে মেলাটি।
বিজ্ঞান মেলার উদ্দেশ্য ও শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে রণিত স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান সাগর কুমার সাহা বলেন, ‘শুধু পড়াশোনার মধ্যেই শিক্ষার্থীদের বিকাশ সীমাবদ্ধ নয়। খেলাধুলা, বিজ্ঞান মেলা, গণিত উৎসব, ইংলিশ ক্লাবসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের আয়োজন করা হয় সারা বছর। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, ‘একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন সীমিত সময় শিক্ষকদের কাছে থাকে। শিক্ষকরা তাদের উৎসাহ দেন, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। এরপর শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা ও চেষ্টার মাধ্যমে কাজকে এগিয়ে নেয়। কোনো প্রকল্পের সাফল্যকে শুধু শিক্ষকের অবদান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের নিজেদের মেধা ও প্রচেষ্টাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।’
বিজ্ঞান মেলাটি ৭ থেকে ৮ বছর ধরে আয়োজন করা হচ্ছে জানিয়ে সাগর কুমার সাহা বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিবছর ১০ থেকে ১২টি সহশিক্ষা কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে গণিত উৎসব, বিজ্ঞান মেলা, বিতর্ক, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা।’
ধর্মীয় আয়োজনের মধ্যে গীতা পাঠ, আমানাত ও কিরাত প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, ক্যারম ও লুডু টুর্নামেন্টও অনুষ্ঠিত হয়।
মেলার শেষে ৪টি বিভাগে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। প্রিপারেটরি বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইস ইয়ামান ফাইজান। তার প্রকল্প ছিল ‘সোলার ড্রিপ ইরিগেশন মডেল’। একই বিভাগে দ্বিতীয় শ্রেণির মো. রিশাম আলমের ‘হাইড্রোলিক ক্রেন’ প্রকল্প দ্বিতীয় এবং প্রথম শ্রেণির আবরার আল তাহমিদের ‘আগ্নেয়গিরি’ প্রকল্প তৃতীয় স্থান অর্জন করে।
প্রাইমারি বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. নূর হাসান সাফিন। তার প্রকল্প ছিল ‘মানবদেহের ফুসফুসের গঠন’। একই বিভাগে পঞ্চম শ্রেণির সায়েম খান, শাহাদাত হোসাইন সিয়াম ও জুনায়েত হোসাইন জিয়ানের দলীয় প্রকল্প ‘দ্য পলিউশন অ্যান্ড হাউ টু রিডিউস’ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে।
জুনিয়র বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আশুরা ইসলাম জুঁই। তার প্রকল্পের বিষয় ছিল ‘ওয়েস্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে সপ্তম শ্রেণির আব্দুল্লাহ ফারহান, জারিফ মাহমুদ বর্ণ, অরিদ্র আকন্দ প্রত্যুষ ও সোহাম হোসেনের দল। তাদের প্রকল্পে পানিচক্র, পানি বিশুদ্ধকরণ ও সেন্সর ওয়াটার ফিল্টার তুলে ধরা হয়। তৃতীয় স্থান অর্জন করে অষ্টম শ্রেণির জিহাদ হোসেন, হোসেন মাহমুদ, ফাহাদ ইবনে ফরিদ ও আজিমুল ইসলাম সামিরের দলীয় ‘হাইড্রো ইলেক্ট্রিসিটি মডেল’ প্রকল্প।
সেকেন্ডারি বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে নবম শ্রেণির জাফানা মালিহা আশকা, ফাতিহা রয়া, মালিহা হোসাইন শশী ও সামিয়া তাবাসসুম কাশফার দল। তাদের প্রকল্প ছিল ‘হিউম্যান ব্রেইন ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের তুলনা’। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে নবম শ্রেণির আফনান হোসাইন রাফি ও ফারহান শাহরিয়ার ধ্রুবর ‘ডিএনএ মডেল’ প্রকল্প। তৃতীয় স্থান অর্জন করে দশম শ্রেণির আল আরাফ রিহাম ও মো. ইয়াসিনের ‘সিমেন্টের মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ন্ত্রণ’ প্রকল্প।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗