ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব এবং সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন সহজ করতে বিশেষ অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণবিষয়ক রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গতকাল রবিবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
শেরেবাংলা নগরে ১৪টি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা : বর্তমান সচিবালয়ের ভবনগুলোর ভূমিকম্পঝুঁকি, স্থানসংকট এবং কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাব উত্থাপন করে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বর্তমানে সচিবালয়ের ১৭ দশমিক ৫৭ একর জায়গায় মোট ১৩টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার
আগে নির্মিত। পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবন ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবন ১৯৪৭ সালে নির্মিত হয়। ফলে ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা হয়নি। ভূমিকম্পপ্রবণ ঢাকা শহরে এসব ভবনে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত অফিসকক্ষ ও ওয়াশ-ব্লক না থাকায় স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে সচিবালয়ে অফিস স্পেস রয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ৭৬ হাজার বর্গফুট। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত চাহিদা এবং সচিবালয় প্রাঙ্গণের বাইরে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এক জায়গায় আনার জন্য আরও ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি জায়গা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী স্থাপত্য অধিদপ্তর এজন্য ধারণাগত নকশা তৈরি করেছে।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। তিনটি বেজমেন্টসহ ভবনগুলোতে মোট প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস থাকবে। ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পার্কিং মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকবে; এর মধ্যে ২০০টি ভূ-উপরিস্থ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য রাখা হবে।
‘নারী ও শিশুবিষয়ক : মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। প্রস্তাবটি উত্থাপন করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ অধ্যাদেশ : সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তবে অধ্যাদেশটি চূড়ান্তভাবে জারির আগে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সম্পন্ন করতে হবে।
আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ হ্রাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য সামনে রেখে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রণীত ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’-এর আওতায় আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
এ লক্ষ্যে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি কোম্পানির ভবনের ছাদে বিনিয়োগকারীর অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিকে বলা হয় অপারেশনাল এক্সপেনডিচার বা ওপেক্স মডেল। যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় রয়েছে, তাদের জন্য নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্যাপেক্স মডেলও রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশটি কার্যকর হলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকের দায়িত্ব, চুক্তি এবং সেবা ব্যবস্থাপনা আরও সুস্পষ্ট করার সুযোগ তৈরি হবে।
রটারডাম কনভেনশনে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ : বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাব উত্থাপন করে। ‘রটারডাম কনভেনশন অন দ্য প্রায়র ইনফর্মড কনসেন্ট প্রসিডিউর ফর সার্টেন হ্যাজার্ডাস কেমিক্যালস অ্যান্ড পেস্টিসাইডস ইন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’ ১৯৯৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গৃহীত হয় এবং ২০০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হয়। কনভেনশনটির আওতায় বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পূর্বসম্মতিভিত্তিক সিদ্ধান্তের ব্যবস্থা রয়েছে।
মন্ত্রিসভার প্রেস ব্রিফ অনুযায়ী, কনভেনশনটিতে ১৬৭টি দেশ সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ফলে কনভেনশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। তবে এ সিদ্ধান্তের পর আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
