সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারের এ পদক্ষেপকে ‘জরুরি অবস্থার আড়ালে অভ্যুত্থান’ বলে অভিহিত করেছেন পিটিআইয়ের এক মুখপাত্র। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
গতকাল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এর আগে কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ করে, আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এ প্রদেশে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি ও নতুন গভর্নর নিয়োগের ফলে ইমরান খানের পিটিআই এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে চলমান বিরোধ আরো তীব্র হয়েছে। এর এক সপ্তাহ আগে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রার উদ্দেশ্যে প্রদেশটিতে জড়ো হয়েছিলেন পিটিআইয়ের সমর্থকরা।
পদযাত্রার পরিকল্পনার আগে কয়েকশ নেতাকর্মী এবং ইমরান খানের তিন বোনকে আটক করা হয়। পিটিআই এ ঘটনাকে কয়েক বছরের মধ্যে দলটির ওপর চালানো অন্যতম কঠোর দমন-পীড়ন বলে বর্ণনা করেছে।
ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পিটিআইয়ের মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি সরকারের এ পদক্ষেপকে ‘জরুরি অবস্থার আড়ালে অভ্যুত্থান’ বলে অভিহিত করেছেন। তার ভাষ্য, এ সিদ্ধান্ত আরো রক্তপাত ও অস্থিতিশীলতা উসকে দিতে পারে। বিক্ষোভ ঠেকাতেই সরকার এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পাকিস্তানের সংবিধানে জরুরি অবস্থার সময় প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নেয়ার বিধান রয়েছে। দেশটির আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানিয়েছেন, খাইবার পাখতুনখোয়ায় গভর্নর প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্ব নেবেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এ প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার সংখ্যা বেড়েছে।
ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে তারার বলেন, প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের জন্য গভর্নর দায়িত্ব পালন করবেন। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী মেয়াদ বাড়তে পারে। এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রদেশটিতে সেনা মোতায়েন করা হবে।
কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, পিটিআই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দলটি বলছে, প্রয়োজনীয় অর্থ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করেনি ইসলামাবাদ।
এর আগে খাইবার পাখতুনখোয়ার দায়িত্বে থাকা মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
সরকারের সঙ্গে পিটিআইয়ের বিরোধ মীমাংসায় মধ্যস্থতার দায়িত্ব পাওয়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজলের (জেইউআই-এফ) নেতা মাওলানা ফজলুর রহমানও জরুরি অবস্থা জারির নিন্দা জানিয়েছেন। ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘জরুরি অবস্থা জারি গণতন্ত্রের ওপর অতর্কিত হামলা।’
এদিকে রাজধানী ইসলামাবাদে বিক্ষোভকারীদের পার্লামেন্টে পৌঁছানো ঠেকাতে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করেছে সরকার। সড়কে কনটেইনারও রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে সড়ক অবরোধ করা যায়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ইমরান খানের সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছিলেন। তবে তারা শুধু খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশেই সরকার গঠন করতে পেরেছিলেন। ৭৪ বছর বয়সী সাবেক ক্রিকেট তারকার সমর্থকদের অভিযোগ, সামরিক বাহিনী নির্বাচনে কারচুপি করে তাকে ক্ষমতার বাইরে রেখেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে সামরিক বাহিনী।
ইমরান খানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উপহারসংক্রান্ত অনিয়ম, সহিংসতায় উসকানি এবং বেআইনিভাবে বিয়ে করার অভিযোগসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দেয়া একটি ছাড়া বাকি সব দণ্ডাদেশ স্থগিত অথবা বাতিল হয়েছে। এসব মামলায় আপিল বিচারাধীন।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পরামর্শে জরুরি অবস্থা জারি করেন প্রেসিডেন্ট জারদারি।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে শাহবাজ শরিফ বলেন, গত দুই বছর ধরে নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ নাগরিকেরা হামলার শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারি না।’
ইসলামাবাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালায় এমন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে আফগানিস্তান। আরো অভিযোগ, কাবুলের তালেবান সরকার এবং পাকিস্তানে তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল পিটিআই। তবে পিটিআই ও আফগানিস্তান—উভয় পক্ষই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
