যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ—হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও বাণিজ্যব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কমেছে, অন্যদিকে বিকল্প পথ হিসেবে বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্ব বেড়েছে। তবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার হুমকি এই বিকল্প পথেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা, বাড়ছে তেলের বাজারে চাপ
ইরান এখন হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা জোরদার করছে। এতে অঞ্চলটি থেকে তেল রপ্তানির পরিমাণ কমছে এবং বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে থাকছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সর্বশেষ প্রতি ব্যারেল ১০৯ দশমিক ৭৪ ডলারে পৌঁছেছে। আগের দিনের নিষ্পত্তিমূল্যের তুলনায় দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির ভেতরে বা এর কাছাকাছি জাহাজে হামলার ১২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া, চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে পৃথক দুটি ঘটনায় অজ্ঞাত প্রক্ষেপণের আঘাতে দুটি পণ্যবাহী জাহাজ ডুবে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিপুল পরিমাণ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হওয়ায় ইরান হামলা জোরদার করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রণালিটি দিয়ে তেল পরিবহনে সহায়তা করে একটি কার্যকর অভিযান পরিচালনা করেছে।
এ ক্ষেত্রে ‘ডার্ক’ ট্রানজিটের সহায়তা নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যেসব ট্যাংকারের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকে, সেগুলো প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগরে অপেক্ষমাণ জাহাজে তেল পৌঁছে দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে ইরান নিজের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে এই জলপথ দিয়ে চলাচল করাতে এখনো হিমশিম খাচ্ছে।
ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে ‘অননুমোদিত’ পথে চলাচলকারী জাহাজেও হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির ভেতরে বা এর কাছাকাছি অন্তত ২১টি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের হুমকি
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও হুমকির মুখে পড়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে পরে ইয়েমেন সরকার তাদের পিছু হটতে বাধ্য করে।
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি জাহাজে হামলা শুরু করলে এই নৌপথ দিয়ে চলাচল ব্যাহত হতে থাকে। জুলাই থেকে হামলা আরও বেড়েছে। এ ছাড়া, সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও হামলার শিকার হয়েছে।
আট মাসে গড়ানো এই সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এতে ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের মধ্যে লড়াইও যুক্ত হয়েছে। হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এ ছাড়া, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা যদি সব দেশের জাহাজকে হুমকি দিতে শুরু করে, তাহলে অপরিশোধিত তেলের বাজারে নতুন করে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল বলেন, এতে তেলের দাম আবারও বাড়বে এবং সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য আরও সংকুচিত হবে।
সৌদি আরবের তেল রপ্তানির পথ বদল
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। দেশটির এই প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন ২ লাখ ৩২ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে মার্চ থেকে গড়ে ২৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। অর্থাৎ, রপ্তানি বেড়ে যায় প্রায় ১০ গুণ।
এনার্জি অ্যাসপেক্টসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জের মতে, একপর্যায়ে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা হতো। এর বড় অংশ—প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল—বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
তবে চলতি গ্রীষ্মে হুতিদের হুমকি বাড়তে শুরু করার পর এই পথে তেল পরিবহনের প্রবাহ ‘ধসে পড়ে’ বলে জানান ব্রোঞ্জ।
এদিকে, গত মাসে ইরাকের ভেতর থেকে ড্রোন হামলা চালিয়ে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল দেশটির লোহিত সাগরের বন্দরগুলোর দিকে নেয়া হয়। হামলার পর দ্রুত কৌশল পরিবর্তন করে রিয়াদ। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত শাটল অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বাড়ায় সৌদি আরব।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সেপ্টেম্বরে চালানো ওই হামলার পেছনে সম্ভবত ইরান ছিল। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাকের ভেতরে সক্রিয় বলে জানা যায়। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ অভিযোগ ‘দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান’ করেছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি এখন আবার চালু হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব তেলের বাজারে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট বিশ্ববাজারে তেলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বে মোট তেল পরিবহনের প্রায় ৪০ শতাংশ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—এই দুটি প্রণালি দিয়ে হতো। সৌদি আরব রপ্তানির পথ পরিবর্তন করায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কমেছে, অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে বেড়েছে। তবে বিকল্প পথ ব্যবহারের কৌশল কিছুটা সহায়ক হলেও, এই দুই নৌপথ দিয়ে সম্মিলিত তেল পরিবহনের পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সৌদি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এশিয়ার দেশগুলো যুদ্ধের সময় এই সংকটের বড় ধাক্কা সামলেছে। তবে তেলের ব্যবহার কমিয়ে তারা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। চীনও কৌশলগত মজুত থেকে তেল ব্যবহার করে আমদানি অনেক কমিয়েছে। এই সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ নতুন পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরির বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
২০২৪ সালে সৌদি আরব ১৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। দেশটির তেল রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার এশিয়া। সৌদি আরবের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশ গ্রহণ করে এশিয়ার দেশগুলো। ২০২৪ সালে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ভারত সম্মিলিতভাবে দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৬৬ শতাংশ গ্রহণ করেছে।
ব্রুগেল নামের গবেষণা সংস্থার জ্যেষ্ঠ ফেলো জর্জ জাখমান সিএনএনকে বলেন, তেল আমদানিকারক দেশগুলো বুঝতে পারছে, বাইরের ধাক্কায় কম ক্ষতিগ্রস্ত হতে হলে তাদের কাঠামোগতভাবে তেলের ব্যবহার কমাতে হবে। অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি এই উদ্যোগ তাদের ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠা বিশ্ব থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
কেপলারের জোহানেস রাউবালের মতে, এই সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ইরানের প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা তত কমবে। কারণ, অন্যান্য দেশ বিকল্প পথে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারছে।
