পর্যটন এখন শুধু বিনোদন বা অবকাশযাপনের বিষয় নয়। এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক বিনিময়, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং মানুষে-মানুষে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
একজন পর্যটক অন্য দেশে গিয়ে শুধু সেখানকার দর্শনীয় স্থান দেখেন না; তিনি দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনধারা ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন। এই পরিচয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে, যা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ককেও শক্তিশালী করে।
ভুটান ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে আরও গভীর, কার্যকর ও জনসম্পৃক্ত করতে পর্যটন কূটনীতি বিশেষ ভুমিকা রাখতে পারে।
ভুটান-বাংলাদেশ সম্পর্কের সূচনা অত্যন্ত গৌরবময়। ভুটান সরকারের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভুটান প্রথম দেশ হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ১২ মে এবং ১৯৮০ সালে ঢাকা ও থিম্পুতে আবাসিক কূটনৈতিক মিশন স্থাপিত হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্নে ভুটানের এই স্বীকৃতি দুই দেশের সম্পর্ককে বিশেষ ঐতিহাসিক মর্যাদা দিয়েছে। একজন ভুটানি হিসেবে আমি মনে করি, এই বন্ধুত্বকে শুধু রাষ্ট্রীয় সফর ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পর্যটন, সংস্কৃতি, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরও সম্প্রসারিত করা উচিত।

ভুটান তার হিমালয়, সবুজ পাহাড়, নির্মল পরিবেশ, প্রাচীন জং বা দুর্গ, বৌদ্ধবিহার এবং স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। পারো, থিম্পু, পুনাখা, ফোবজিখা ও বুমথাংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
- পারোর তাকসাং মঠ বা টাইগার্স নেস্ট, পুনাখা জং, বুদ্ধ দোরদেনমা এবং পাহাড়ঘেরা শান্ত জনপদগুলো ভুটানের নিজস্ব পরিচয় বহন করে। মোট জাতীয় সুখ বা গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসের দর্শন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মূল্যভিত্তিক পর্যটননীতি ভুটানকে একটি ব্যতিক্রমী গন্তব্যে পরিণত করেছে। ভুটান ভ্রমণ শুধু স্থান দর্শন নয়; এটি প্রকৃতি, শান্তি, আধ্যাত্মিকতা ও ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা অনুভব করার সুযোগ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অসাধারণ বৈচিত্র্েয সমৃদ্ধ। কক্সবাজারের বিস্তৃত সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, কুয়াকাটার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, সিলেটের চা-বাগান ও হাওর, বান্দরবান-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ির পাহাড়, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় ও সোনারগাঁ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো মূল্যবান সম্পদ।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, লোকসংগীত, উৎসব, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা দেশটির পর্যটনে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

ভুটানের পাহাড় ও বাংলাদেশের সমুদ্র, নদী ও বনকে যৌথ পর্যটন পরিকল্পনায় যুক্ত করা গেলে পর্যটকেরা একই অঞ্চলে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিন্তু পরিপূরক অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।
- দুই দেশের সরকারি পর্যটন কর্তৃপক্ষ, বিমান সংস্থা, ট্যুর অপারেটর ও হোটেল ব্যবসায়ীরা সম্মিলিতভাবে “হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর” নামে যৌথ পর্যটন প্যাকেজ চালু করতে পারেন। এর আওতায় পারো-থিম্পু-পুনাখার সঙ্গে ঢাকা-কক্সবাজার-সুন্দরবন অথবা ঢাকা-সিলেট-পার্বত্য চট্টগ্রামকে যুক্ত করা যেতে পারে।
ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার পর্যটকদের কাছে পাহাড়, সমুদ্র, বন, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এমন সমন্বিত ভ্রমণ বিশেষ আকর্ষণীয় হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য ভুটানের পরিবারভিত্তিক, শিক্ষামূলক ও আধ্যাত্মিক ভ্রমণ এবং ভুটানি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশের সমুদ্র, সুন্দরবন ও ঐতিহাসিক স্থানকেন্দ্রিক সাশ্রয়ী প্যাকেজ তৈরি করা দরকার।
পর্যটন সম্প্রসারণের জন্য নির্ভরযোগ্য, নিয়মিত ও সাশ্রয়ী বিমান যোগাযোগ অপরিহার্য। ড্রুক এয়ারের ২০২৬ সালের প্রকাশিত সময়সূচিতে পারো-ঢাকা-পারো সরাসরি ফ্লাইট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যাত্রীদের চাহিদা ও ভ্রমণ মৌসুম বিবেচনায় এ রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা ও আসনক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
বিমানভাড়া সাধারণ পর্যটক, শিক্ষার্থী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের মধ্যে রাখতে বিশেষ ছাড় এবং বিমান টিকিট, হোটেল ও স্থানীয় পরিবহনসমন্বিত প্যাকেজ চালু করা দরকার। ঢাকা ও পারো বিমানবন্দরে পর্যটক সহায়তা ডেস্ক স্থাপন করে ভিসা, হোটেল, পরিবহন, মুদ্রা বিনিময় ও জরুরি যোগাযোগের তথ্য দেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশি নাগরিকদের ভুটান ভ্রমণের ক্ষেত্রে তথ্য নির্ভুলভাবে প্রচার করা জরুরি। ভুটানের অভিবাসন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকেরা ভুটানে প্রবেশের সময় ভিসা পাওয়ার যোগ্য। তবে তাদের নির্ধারিত প্রবেশ প্রক্রিয়া ও সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ফি বা এসডিএফ সংক্রান্ত বিধান পালন করতে হয়। দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা এড়াতে আগেই অনলাইনে আবেদন ও প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধের সুযোগ রয়েছে।
ভুটানের সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমার প্রথম ১৫ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক জনপ্রতি দৈনিক ১৫ মার্কিন ডলার বা ১,২০০ নুগুলট্রাম হারে হ্রাসকৃত এসডিএফ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। এসব নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে বলে ভ্রমণের আগে ভুটানের সরকারি পর্যটন ও অভিবাসন ওয়েবসাইটে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা উচিত।
স্থলপথে সহজ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে দুই দেশের পর্যটনে নতুন গতি আসতে পারে। তবে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে বিবিআইএন মোটরযান চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রক্রিয়ার বিষয়; এটিকে বর্তমানে চালু সরাসরি পর্যটক পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্মতি ও প্রয়োজনীয় প্রটোকল সম্পন্ন হলে পর্যটকবাহী বাস, ব্যক্তিগত যান এবং সংগঠিত পর্যটন কাফেলা চালুর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এতে ভ্রমণ ব্যয় কমবে, সীমান্তবর্তী এলাকার ব্যবসা বাড়বে এবং আঞ্চলিক পর্যটনের নতুন বাজার তৈরি হবে।

- পর্যটন কূটনীতিকে এগিয়ে নিতে ঢাকা ও থিম্পুতে পালাক্রমে পর্যটন মেলা, সাংস্কৃতিক উৎসব, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, খাদ্য উৎসব ও ব্যবসায়িক সম্মেলন আয়োজন করা যেতে পারে। দুই দেশের সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, শিক্ষার্থী, শিল্পী এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের বিনিময় সফর চালু করা দরকার।
ভুটানি গণমাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভুটানের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি নিয়ে অনুষ্ঠান ও বিশেষ প্রকাশনা প্রচার করা হলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়বে। সভা-সেমিনার যেন শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, স্মারক বিনিময় ও ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি আয়োজন থেকে সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
ভুটান ও বাংলাদেশ উভয়ই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ভুটানের হিমবাহ, পাহাড় ও বন এবং বাংলাদেশের নদী, উপকূল ও সুন্দরবন একই বিস্তৃত আঞ্চলিক পরিবেশব্যবস্থার অংশ। তাই পর্যটন সম্প্রসারণের নামে বন ধ্বংস, পাহাড় কাটা, প্লাস্টিক দূষণ বা অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ গ্রহণযোগ্য নয়।

- পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই পর্যটনে ভুটানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে, বৃহৎ পর্যটন বাজার, আতিথেয়তা, সমুদ্র ও উপক‚লীয় পর্যটনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও ভুটানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যৌথ প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও দক্ষতা বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশ পরিবেশবান্ধব পর্যটনের একটি আঞ্চলিক মডেল তৈরি করতে পারে।
ভুটান-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের পারস্পরিক শ্রদ্ধা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। এখন প্রয়োজন সাশ্রয়ী বিমান যোগাযোগ, সঠিক ভ্রমণ তথ্য, যৌথ পর্যটন প্যাকেজ, পর্যটন মেলা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, দক্ষ জনবল এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রচারণা।
পর্যটন কূটনীতিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া গেলে এটি শুধু পর্যটকের সংখ্যা ও অর্থনৈতিক আয় বাড়াবে না বরং দুই দেশের মানুষের হৃদয়ের দূরত্বও কমিয়ে আনবে।
হিমালয়ের শান্তি ও বঙ্গোপসাগরের বিশালতার মধ্যে যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সেতু রয়েছে, পর্যটনের মাধ্যমে তাকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করাই হোক আমাদের যৌথ অঙ্গীকার।
লেখক : অচিত অধিকারী, সাধারণ সম্পাদক, ভুটান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি।
