প্রাইমারি গ্লুকোমায় ডায়াবেটিস একটি অন্যতম প্রধান ঝুঁকি বা রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। কারণ ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক ব্যাধি। এটি সরাসরি প্রাণঘাতী না হলেও শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে অত্যন্ত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানবদেহের কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট করার পাশাপাশি এটি সরাসরি চোখ ও দৃষ্টিশক্তির ওপর আঘাত হানে। কোনো প্রাথমিক উপসর্গ প্রকাশ না পেয়ে ধীরে ধীরে ক্ষতি করে বলে ডায়াবেটিসকে প্রায়শই ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নীরব ঘাতক হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে রোগীর জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হয়; বিশেষ করে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা ও সার্বিক জীবনচর্যা নিয়মমাফিক পুনর্গঠন করা জরুরি হয়ে পড়ে।
দৃষ্টিশক্তির ওপর ডায়াবেটিসের প্রভাব অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ক্ষতিকর। এটি মূলত কয়েক ধরনের চক্ষুরোগের সৃষ্টি করে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি। রেটিনা চোখের আলো গ্রহণকারী ও সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। রক্তে শর্করার পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়লে রেটিনার সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে সেখানে রক্তপাত, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও পানি জমার মতো জটিলতা তৈরি হয়, যা রোগীকে ক্রমান্বয়ে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে চোখে তীব্র যন্ত্রণা হতে পারে। এটি প্রতিরোধে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শে লেজার থেরাপি নেওয়া এবং প্রতি ছয় মাস পর পর চোখ পরীক্ষা করানো আবশ্যক।
দ্বিতীয়ত, ডায়াবেটিসের কারণে লেন্সে অতিরিক্ত শর্করা জমে লেন্স ফুলে যায় ও অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে, যাকে ডায়াবেটিসজনিত ছানি বলা হয়। এতে আলো রেটিনায় পৌঁছাতে পারে না এবং দৃষ্টি ঝাপসা হতে থাকে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অস্বচ্ছ লেন্স অপসারণ করে কৃত্রিম লেন্স প্রতিস্থাপনের দ্বারা এই দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। তবে রেটিনায় আগে থেকেই কোনো জটিলতা থাকলে পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি নাও ফিরতে পারে।
তৃতীয়ত, অনিয়ন্ত্রিত শর্করা লেন্সকে ফুলিয়ে সাময়িক মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টির সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করে চশমা নিলে ঘন ঘন পাওয়ার পরিবর্তন করতে হয়, তাই শর্করা স্বাভাবিক অবস্থায় এনেই চশমার পাওয়ার নির্ধারণ করা উচিত। সর্বশেষ ও সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতা হলো গ্লুকোমা। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে চোখে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। শরীর তখন বিকল্প হিসেবে নতুন রক্তনালি তৈরি করে, যা পরবর্তী সময় রক্তপাত ও অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়িয়ে গ্লুকোমার জন্ম দেয়। এ ছাড়া ডায়াবেটিস থেকে চোখের স্নায়ু দুর্বল হয়ে অপটিক নিউরাইটিস কিংবা মাংসপেশির ভারসাম্যহীনতার কারণে চোখ ট্যারা হয়ে যেতে পারে। তাই নিয়মিত পরীক্ষা, লেজার চিকিৎসা এবং কঠোরভাবে শর্করা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই কেবল এ জাতীয় অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভব।
লেখক : গ্লুুকোমা বিশেষজ্ঞ
বিভাগীয় প্রধান, এবং পরিচালক
বাংলাদেশ আই হসপিটাল
মালিবাগ মোড়, ঢাকা
