চীনের প্রত্যন্ত তিব্বত অঞ্চলে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৪৬ জন, যাঁদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর। ভূমিকম্পে ৩৩৯টি বাড়ি ধসে পড়েছে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় শত শত পুলিশ ও উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এর উৎপত্তিস্থল ছিল উত্তর তিব্বতের নাগকু শহর থেকে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর-পূর্বে একটি পার্বত্য এলাকায়। তিব্বতের আঞ্চলিক রাজধানী লাসা থেকে উৎপত্তিস্থলটির দূরত্ব প্রায় ৩৯০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, ভূমিকম্পে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ৩০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া আঞ্চলিক অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার বাহিনীর ৩৪৭ জন কর্মীকে দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
ভূমিকম্পের প্রভাবে বাকেন কাউন্টির প্রশাসনিক কেন্দ্রে বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ সেবা ব্যাহত হয়েছে। ওই এলাকার মারু টাউনশিপের উপপ্রধান লাওয়াং দাগপো জানিয়েছেন, টাউনশিপ কার্যালয়ে ভূমিকম্পের কম্পন স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। এতে কার্যালয়ের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে।
ভূমিকম্পের সময় রেস্তোরাঁ থেকে কর্মীদের দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসা এবং সুপারমার্কেটের তাক থেকে পণ্য পড়ে যাওয়ার দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকাশিত ভিডিওতে উদ্ধারকর্মীদের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে। কয়েকটি ভবনের ছাদ ধসে পড়েছে। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।
তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে পার্থক্য রয়েছে। ২৩ অক্টোবরের পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৬ বলা হয়েছে। তাই সর্বশেষ যাচাইযোগ্য তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ১৬ উল্লেখ করাই যুক্তিযুক্ত।
আগের ভূমিকম্পেও ব্যাপক প্রাণহানি
তিব্বতে এর আগেও ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিংরি কাউন্টিতে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ১২৬ জন নিহত হন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গানসু প্রদেশে ভূমিকম্পে অন্তত ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০০৮ সালে সিচুয়ান প্রদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন। তাঁদের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার ছিলেন স্কুলশিক্ষার্থী।
এদিকে, তিব্বতের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের কয়েক সপ্তাহ আগে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসেও ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এসব দুর্যোগে উদ্ধারকাজ পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাইওয়ানের দিকে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী টাইফুন
অন্যদিকে, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় চ্যাম্পির প্রভাবে বিপর্যয়ের আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে তাইওয়ান। শুক্রবার দ্বীপটির অধিকাংশ এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসের আশঙ্কায় ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে একজন নিহত ও ৯৪ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৯১ কিলোমিটার ছিল। শুক্রবার এটি তাইওয়ানের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থান করছিল। ঝড়টির বিস্তৃতি প্রায় ৩২০ কিলোমিটার হওয়ায় দ্বীপটির অধিকাংশ এলাকায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে শুক্রবারের জন্য দেশটির সব ২৬২টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়। পাশাপাশি ৩৫০টির বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয় আর্থিক বাজার এবং অধিকাংশ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। তবে উচ্চগতির রেলসহ কিছু গণপরিবহন সীমিত বা স্বাভাবিকভাবে চালু ছিল।
কর্তৃপক্ষ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেয়। পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, চ্যাম্পি তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছ দিয়ে অতিক্রম করে উত্তর দিকে চীনের উপকূলের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। পরে এটি দক্ষিণ জাপানের দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গতিপথ পরিবর্তন হলে তাইওয়ানে সরাসরি আঘাত হানার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাব প্রায় দুই দিন স্থায়ী হতে পারে।
তাইওয়ানে সাধারণত ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে শক্তিশালী বাতাস, ভারী বৃষ্টি ও উপকূলীয় এলাকায় উত্তাল ঢেউয়ের কারণে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
সানা/আপ্র/২৩/১০/২০২৬
