আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং নির্বাচনী তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন রাহুল গান্ধী ও 'ইন্ডিয়া' জোটের অন্য়ান্য নেতৃত্ব। সেই আবেদনে ১৪টি ত্রুটি চিহ্নিত করেছে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রি। কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী এবং বিরোধী শিবিরের আরও ১০ জন নেতার দায়ের করা এই আবেদনটি এখনও শুনানির জন্য তালিকাভুক্তির ছাড়পত্র পায়নি।
আবেদনে ত্রুটি চিহ্নিত করা সুপ্রিম কোর্টের নথিপত্র দাখিল প্রক্রিয়ারই একটি সাধারণ অংশ এবং আদালতে দায়ের করা সব আবেদনের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য। এই মামলায় চিহ্নিত ত্রুটিগুলোর মধ্যে রয়েছে, আইনজীবীকে প্রতিনিধিত্ব করার অনুমতিপত্র (অথরাইজেশন) না থাকা বা তাতে স্বাক্ষর না থাকা, অস্পষ্ট সহায়ক নথিপত্র এবং আদালতের ফি (কোর্ট ফি) বাবদ ২২০ টাকার কম জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় দায়ের করা রিট পিটিশনে কেন ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচন কমিশনারদের ‘প্রাইভেট রেসপন্ডেন্ট’ বা বিবাদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সে বিষয়েও রেজিস্ট্রি কারণ জানতে চেয়েছে।
এই আপত্তিগুলো মূলত নথিপত্র দাখিলের নিয়মকানুন সংক্রান্ত। এগুলোর অর্থ এই নয় যে আবেদনের গুণাগুণ বা সারবত্তা নিয়ে আদালত কোনও রায় দিয়েছে।
রেজিস্ট্রি কী কী ত্রুটি চিহ্নিত করেছে?
রেজিস্ট্রি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের পরিচয়পত্রের একটি স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য প্রতিলিপি চেয়েছে। এছাড়া ৩ থেকে ১১ নম্বর আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ‘ওকালতনামা’ (আইনজীবীকে প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা দেওয়ার নথি) জমা না পড়া বা তাতে স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নয়জন নেতা হলেন- সৌগত রায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী প্রসাদ যাদব, সঞ্জয় রাউত, এম এ বেবি, ডি রাজা, মহুয়া মৈত্র মাজি, সুপ্রিয়া সুলে এবং ই টি মহম্মদ বশির।
রেজিস্ট্রি সহায়ক নথিপত্রের স্পষ্ট প্রতিলিপি চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের ২৪ জুন, ২০২৫-এর ‘এসআইআর’ শুরু করার সিদ্ধান্ত এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া সংক্রান্ত অন্যান্য নথির ডিজিটাল কপি (পেন ড্রাইভে)।
আবেদনে কী চাওয়া হয়েছে?
লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং বিরোধী শিবিরের আরও ১০ জন নেতা সোমবার এই আবেদনটি দায়ের করেন। এতে ‘রেসপন্ডেন্ট’ বা বিবাদী হিসেবে ভারতের নির্বাচন কমিশন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন কমিটি গঠনের আর্জি জানানো হয়েছে। কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং তালিকায় সংশোধনের বিষয়টি পর্যালোচনা করবে।
আবেদনটিতে আরও অনুরোধ করা হয়েছে যে, উত্থাপিত বিষয়গুলোর বিষয়ে আদালত কোনও সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত যেন বিভিন্ন রাজ্যে চলমান ভোটার তালিকা সংশোধন বা বিশেষ পুনর্বীক্ষণ প্রক্রিয়া (এসআইআর) সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।
আবেদনকারীরা এমন নির্দেশের দাবি জানিয়েছেন যাতে কোনও ভোটারকে পূর্ব-নোটিশ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের বা বক্তব্য উপস্থাপনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া ছাড়া তালিকা থেকে বাদ না দেওয়া হয়। পাশাপাশি, পাঞ্জাব ও নির্বাচনমুখী অন্যান্য রাজ্যে যোগ্য ভোটাররা যাতে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে- তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের নাম, নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং লিঙ্গ ও বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান বুথ-ভিত্তিক প্রকাশ করা। সেই সঙ্গে যোগ্য ভোটারদের নাম পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার একটি ব্যবস্থা চালুর আর্জি জানানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নথিপত্র চেয়ে আবেদন
এই আবেদনে এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে জড়িত ফাইল, আলোচ্যসূচি, সভার কার্যবিবরণী, অভ্যন্তরীণ নোট এবং আপত্তিগুলো তলব করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া, এতে ইসিআইনেট ও ইরোনেট সিস্টেমের প্রাসঙ্গিক অ্যাক্সেস লগ এবং ২০২৫ সালের ২৪ জুনের সিদ্ধান্ত-সংক্রান্ত সম্পূর্ণ ফাইলটিও চাওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীরা আদালতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন খতিয়ে দেখা হয় যে, ওই সিদ্ধান্তগুলো সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি ও কার্যকাল) আইন, ২০২৩’-এর ১৮ ধারা এবং প্রযোজ্য বিচারিক রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না।
আবেদনে নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য দায়ী কর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণেরও অনুরোধ করা হয়েছে- যার মধ্যে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০’-এর ৩২ ধারার অধীনে ব্যবস্থা গ্রহণও অন্তর্ভুক্ত, যেখানে তা প্রযোজ্য।
এতে অনলাইন ‘ফর্ম ৬’-এর মাধ্যমে ভোটার নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনেরও দাবি জানানো হয়েছে, যাতে তা ‘ভোটার নিবন্ধন বিধিমালা, ১৯৬০’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় (যদি না ওই বিধিমালা আইনানুগভাবে সংশোধন করা হয়)।
পাঞ্জাবে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি জরুরি উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ
বিষয়টির জরুরি গুরুত্ব বোঝাতে আবেদনে পাঞ্জাবের প্রসঙ্গটি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় দেখা গিয়েছে যে, ওই বছরের জুন মাসে নথিভুক্ত প্রায় ২.১৪ কোটি ভোটারের তালিকা থেকে প্রায় ২০.৬৬ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে।
আবেদনকারীদের যুক্তি হল, এইধরনের অনিয়ম নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং যোগ্য নাগরিকদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধন ও ভোট প্রদানের অধিকার নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
প্রধান বিচারপতির প্রতিক্রিয়ার পর এই আবেদন দায়ের
রবিবার রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গে সাক্ষাতের অনুরোধ জানালে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপরই এই আবেদনটি দায়ের করা হয়।
ওই নেতারা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সংক্রান্ত উদ্বেগ, জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং ট্রেন বাতিল করার বিষয়গুলো নিয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দিতে চেয়েছিলেন।
প্রধান বিচারপতি জানান, সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বৈঠক করাটা ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি এবং বিচার ব্যবস্থার শালীনতার পরিপন্থী হবে। তবে তিনি তাঁদের আশ্বস্ত করেন যে, আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব যেকোনোও আবেদনের শুনানি করা হবে।
