Published on
:
3 min read
এই সময়: পুজোর আগে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভাইরাল’ ছিল মধ্য কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের থিম–‘অরব’। বেশ কয়েকটি সংস্থা থেকে পুরস্কারও পায় তারা। শনিবার দুর্গাপুজোর প্রথম সপ্তমীর রাতে সেই পুজোতেই পদপিষ্ট হয়ে একাধিক দর্শনার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, মৃতের সংখ্যা ১৯। এদের মধ্যে ৯ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও ২৫ জন জখম অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। রাতেই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে যান মুখ্যমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। ছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ঘটনার তদন্তে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কলকাতা হাইকোর্টের একজন সিটিং জাজকে যাতে কমিটিতে রাখা যায় সে জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানানো হবে। মৃতদের পরিবারগুলিকে ২৫ লক্ষ এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে।’ রাতেই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে মৃতদের পরিবারের জন্য ২ লক্ষ এবং আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়েছে।
আগাম কর্মসূচি থাকায় শনিবার রাতে কলকাতায় আসেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রবিবার শহরে তাঁর সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের সব কর্মসূচিও বাতিল করা হচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। ঘটনার পরে চোরবাগানের পুজো মণ্ডপ বন্ধ করে দেয় কলকাতা পুলিশ। রাতের দিকে ভিড় রয়েছে এমন একাধিক পুজো মণ্ডপ সাময়িক ভাবে দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। লালবাজার সূত্রে খবর, অভিযুক্ত পুজো কমিটির একাধিক কর্তাকে ইতিমধ্যেই আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ উত্তর এবং মধ্য কলকাতায় ঝেঁপে বৃষ্টি শুরু হয়। রাস্তায় তীব্র যানজট দেখা দেয়। সে সময়ে চোরবাগান পুজো মণ্ডপের ভিতরে যাওয়ার জন্য কয়েক হাজার মানুষ অপেক্ষা করছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী বিশ্বজিৎ দাস বলেন, ‘বৃষ্টির জন্য ভিড় একটা জায়গায় আটকে গিয়েছিল। এগোনো যাচ্ছিল না। কিন্তু পিছন থেকে লোক আসাও থামছিল না। আচমকা হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ। তাঁরা পরস্পরকে ঠেলাঠেলি করতে থাকলে কয়েক জন মণ্ডপের ভিতরে বৃত্তাকার পথে পড়ে যান। তাঁদের উপর দিয়ে পুরো ভিড়টা চলে যায়।’
সূত্রের খবর, চোরবাগানের মণ্ডপে প্রবেশ করার পরে একটি বৃত্তের মতো ‘এলিভেটেড করিডোর’ রয়েছে। সেখান দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে মণ্ডপ থেকে বেরতে হচ্ছিল। সেই করিডোরেই বিপত্তি ঘটেছে বলে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে। উদ্ধার করে যাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তাঁদের মধ্যে একাধিক দর্শনার্থী সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের অভিযোগ, সময় মতো পুলিশ বা রক্ষীরা হাজির হননি। চেয়েও কোনও সাহায্য মেলেনি। ঘটনায় পরে মণ্ডপের একাংশ ভেঙে অনেককে উদ্ধার করা হয়।
ঠিক কী ভাবে ঘটনা ঘটল?
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, এমনিতেই প্রবল ভিড় হচ্ছিল। চোরবাগানের মণ্ডপ বানানো হয়েছিল অপরিসর এলাকায়। কানা গলি বলতে যা বোঝায়! মণ্ডপসজ্জা এমন ভাবে করা হয়েছিল যে প্রবেশ পথ দিয়ে দর্শনার্থীরা মাতৃ প্রতিমাকে দু’বার চক্কর খেয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিমার সামনে আসবেন। সেখানেই করা হয়েছিল সিঁড়ি। যা এগজ়িট গেট পর্যন্ত দর্শনার্থীদের নিয়ে যায়। ভুক্তভোগীরা জানাচ্ছেন, সে সময়ে প্রবল ভিড়ের চাপ ছিল। বাইরে বৃষ্টি। সে কারণে মণ্ডপের দুটি এগজ়িট গেটই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে জনতার চাপে। অভিযোগ, এমন পরিস্থিতির মধ্যেও মণ্ডপে প্রবেশ বন্ধ করা হয়নি। ফলে নতুন ভিড় এসে জমে থাকা জনতাকে ধাক্কা মারে। আর তার ফলেই মণ্ডপের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। এক প্রত্যক্ষদর্শীর কথায়, ‘মাটিতে পড়ে গিয়ে অনেকে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়।’ মুখ্যমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে জানান, এক বেসরকারি সংস্থার ভলান্টিয়ার ওই সময়ে আচমকা বাঁশি বাজানোয় সমস্যা তৈরি হয়।
দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে এত বড় বিপর্যয় নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই জনতার প্রশ্নের মুখে পড়েছে পুলিশ–প্রশাসন। ঘটনার পরে সেখানে পুলিশের বিশাল বাহিনী, বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর এবং দমকল বাহিনী পৌঁছলেও দর্শনার্থীদের অনেকেরই অভিযোগ, ভিড় যখন বাড়ছিল তখন পুলিশ ও ভলান্টিয়ারদের কার্যত দেখাই মেলেনি। এক মহিলা দর্শনার্থীর কথায়, ‘আমরা ‘হেল্প হেল্প’ বলে চেঁচাচ্ছিলাম। দেখলাম পুলিশও পালিয়ে যাচ্ছে। যে ঘোষক অ্যানাউন্সমেন্ট করছিলেন, তিনিও দর্শকদের বিভ্রান্ত করেছেন।’ আর এক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ‘একজন পুলিশও ছিলেন না, অ্যাম্বুল্যান্সও ছিল না। ভিআইপিদের জন্য রাস্তা ব্লক করে রাখা হয়েছিল। সাহায্যের জন্য প্রশাসনের কেউ এগিয়ে আসেননি। স্থানীয় বাসিন্দারা মণ্ডপের একাংশ ভেঙে আমাদের উদ্ধার করেন।’ এলাকার বাসিন্দারাও এ ব্যাপারে প্রশাসনের উপরে তিতিবিরক্ত। সম্মিলিত ভাবে তাঁদের অনেকেই সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে জানিয়েছেন, অ্যাম্বুল্যান্স বা প্রশাসনের তরফে অন্য কোনও সাহায্য না পেয়ে অ্যাপ–ক্যাব বুক করে তাঁরা আহতদের হাসপাতালে পাঠান। এমনকী, বাইকে করেও অনেক আহতকে মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ দিন একাধিক ভাইরাল ভিডিয়োতেও এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির ছবি ধরা পড়েছে। ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কির পাশাপাশি মাটিতে পড়ে যাওয়া অনেককে ভিড় মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে, এমন ছবিও ভাইরাল হয়েছে। রাস্তার উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় অনেককে। কয়েকশো জুতো এবং ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে ঘটনাস্থলে। অভিযোগ, এই ঘটনার পর থেকে চোরবাগানের পুজো উদ্যোক্তাদের কাউকেই দেখা যায়নি। এমনকী, তাঁদের অনেককে বার বার ফোন করা হলেও জবাব মেলেনি।
