Published on
:
3 min read
এই সময়: প্রথম সপ্তমীর রাতেই নেমে এসেছিল বিপর্যয়ের বিষাদ। চোরবাগানে উৎসবের আলোও নিভে গিয়েছিল গত ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায়। পুজো মণ্ডপের ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা রাজ্যকেও। শেষ পর্যন্ত শনিবার দুপুরে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট)-এর নির্দেশে কড়া পুলিশি প্রহরায় আড়ম্বরহীন ভাবে বিসর্জন হলো চোরবাগান সর্বজনীনের প্রতিমার।
‘ক্রাইম সিন’ যাতে কোনওভাবেই নষ্ট না হয় এবং পুনরায় কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে তা নিশ্চিত করতে এ দিন মোতায়েন করা হয়েছিল বিপুল সংখ্যক পুলিশ কর্মীদের। তদন্তের স্বার্থে এ বছর চোরবাগানের প্রতিমা নিরঞ্জনের প্রথাগত নিয়মেও একাধিক বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রশাসন। অন্য বছরগুলিতে মণ্ডপের পিছন দিক দিয়ে প্রতিমা বের করা হলেও এ বার সিটের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, ঘটনাস্থল যেন সম্পূর্ণ সংরক্ষিত থাকে।
সেই শর্ত মেনে শনিবার দুপুরে মণ্ডপের সামনের গেটের একটি অংশ কেটে প্রতিমা বাইরে আনা হয়। প্রায় ৪০ জন কুলি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাহায্যে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রতিমা তোলা হয় লোহার কার্টে। গোটা প্রক্রিয়ার ভিডিয়োগ্রাফি করা হয়। এরপর ট্রাকের সামনে কালো ব্যানারে মৃত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা বার্তা ঝুলিয়ে নিমতলা ঘাটের দিকে রওনা দেন ক্লাবের সদস্যরা। প্রতিমার আগে মোমবাতি হাতে হেঁটে যান পাড়ার বাসিন্দারা।
হলো না সিঁদুর খেলা
বহু পুরোনো এই পুজোর ভিড় এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত হলেও এ বারের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ছিল না ঢাকের বাদ্যি, উৎসবের আমেজ কিংবা সিঁদুর খেলার আনন্দ। প্রথা অনুযায়ী এ দিন মহিলারা মাকে বরণ করতেও পারেননি। সরু রাস্তা এবং দু’ধারে জনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় যখন প্রতিমা এগিয়ে চলেছে, তখন চারপাশ জুড়ে শুধু কান্নার রোল ও বিষাদের সুর। অনেকেই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে প্রণাম জানান। স্থানীয় এক মহিলা কান্না ভেজা গলায় বলে ওঠেন, ‘কী ভুল ছিল জানি না, কেউ ছেলে হারিয়েছেন, কেউ মা হারিয়েছেন। মা আমাদের সব অন্যায় ক্ষমা করে দিও।’
‘এবারে মাকে বরণ করতে না পারার দুঃখ কোনওদিন ভুলতে পারব না’– চোখের জল মুছতে মুছতে বলছিলেন এলাকার বাসিন্দা কল্পনা চৌধুরী। তাঁর কথায়,‘যা ঘটেছে তারপর আর কিছু বলার নেই। যেটা হলো তা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সপ্তমীর বিকেল পর্যন্ত সবই তো ঠিক ছিল। কোথায় ভুল হলো কে জানে?’
ঘোষকদের ভয়েস স্যাম্পেল
চোরবাগানে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনার ঠিক আগে মাইকে কার গলা শোনা গিয়েছিল? ‘মঞ্চ ভেঙে পড়ছে’ বলে ঘোষণা করার নির্দেশই বা কে দিয়েছিলেন? ১৯ জনের মৃত্যুর তদন্তে সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে এ বার ধৃত দুই ঘোষক কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়া এবং সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টুর কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করতে চলেছে লালবাজার। ঘটনার আগে ঘোষণার অডিয়ো-ভিডিয়োর সঙ্গে ধৃতদের কণ্ঠস্বর মিলিয়ে দেখার জন্য আদালতে আবেদনও জানাতে চলেছেন গোয়েন্দারা। তদন্তকারীদের দাবি, বিপর্যয়ের মুহূর্তে কে কী ঘোষণা করেছিলেন এবং তার নেপথ্যে কার নির্দেশ ছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
শনিবার ব্যাঙ্কশাল আদালত কালিয়াকে আগামী ৬ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সূত্রের খবর, মঞ্চ ভেঙে পড়ার ঘোষণা ঠিক কার নির্দেশে হয়েছিল, সে বিষয়ে ধৃত দুই ঘোষকের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে। ঘটনার আগে ও পরে কী কী ঘোষণা করা হয়েছিল, কখন তা করা হয়েছিল এবং বিপর্যয় ঠিক কোন সময়ে ঘটে— সেই ঘটনাক্রমও মিলিয়ে দেখতে চাইছেন তদন্তকারীরা। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু তথ্য পুলিশের হাতে এসেছে। সেগুলির সঙ্গে বাজেয়াপ্ত অডিয়ো-ভিডিয়ো ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান মিলিয়ে দেখার কাজ চলছে। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সূত্রের দাবি, ঘটনার আগে মাইকে ঘোষণার তিন থেকে চারটি অডিয়ো-ভিডিয়ো ক্লিপ সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারীরা। এ বার সেই রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে ধৃতদের কণ্ঠস্বরের নমুনা মিলিয়ে আসল লোককে শনাক্ত করা হবে। তদন্তের স্বার্থে কালিয়া ও সেন্টুকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করছেন তাঁরা। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৬০ জনের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আহত দর্শনার্থী, হোমগার্ড, স্বেচ্ছাসেবক, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী এবং এলাকার বাসিন্দারা।
আদালতে অভিযুক্ত
শনিবার আদালতে সরকারি আইনজীবী বলেন, ‘চোরবাগান বিপর্যয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। উৎসব আবার ফিরে আসবে, কিন্তু মৃতেরা আর ফিরবেন না।’ তদন্তে কুশল মজুমদারের নাম উঠে এসেছে এবং ঘটনার সময়ে তিনি উপস্থিত ছিলেন বলে আদালতে জানানো হয়। বাজেয়াপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা, অভিযুক্তকে জেরা এবং ঘটনার সঙ্গে আর কারা যুক্ত ছিলেন, তা জানার জন্য কুশলের পুলিশি হেফাজতের প্রয়োজন বলে আদালতে সওয়াল করেন সরকারি আইনজীবী। তার পরেই আগামী ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ধৃতকে পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন বিচারক।
