ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কোথায় এডিস মশার বিস্তার বাড়ছে, তা দ্রুত জানা জরুরি। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে ফাঁদে ধরা মশা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে আলাদা করে শনাক্ত করতে সময় ও শ্রম লাগে। এই প্রক্রিয়াকে সহজ করতে শব্দ, ক্যামেরা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নতুন একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা।
‘মাস্ট-ক্লাউডনেট’ নামের যন্ত্রটি স্ত্রী এডিস মশার ডানার কম্পনের মতো শব্দ ব্যবহার করে পুরুষ এডিসকে আকর্ষণ করে। ফাঁদে আটকে পড়া মশার ছবি তুলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরবর্তী সার্ভারে পাঠায়। পরে এআই মডেল ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে এডিস ও অন্য প্রজাতির মশা শনাক্ত ও গণনা করে। ফলাফল দেখা যায় ওয়েব ড্যাশবোর্ডে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আহসান হাবিব, অধ্যাপক সাঈদ মাহমুদ উল্লাহ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার আশফাকুল মুঈদ। ২০২৬ সালে গবেষণাটি ‘আইইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিন দিনের প্রাথমিক মাঠ পরীক্ষায় শব্দ ব্যবহার করা যন্ত্রে ৪৯টি এডিস ও ১০টি অন্য প্রজাতির মশা ধরা পড়ে। অর্থাৎ মোট ধরা পড়া মশার ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ ছিল এডিস। বিপরীতে শব্দহীন নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে ধরা পড়ে মাত্র একটি এডিস ও তিনটি অন্য প্রজাতির মশা।
তবে মাঠপর্যায়ে এআই ৪৯টি এডিসের মধ্যে ৩৫টিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে। শনাক্তের হার ছিল ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ। গবেষকেরা বলছেন, মশা আকর্ষণ ও পর্যবেক্ষণে যন্ত্রটি সম্ভাবনাময় হলেও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা ছাড়া এর কার্যকারিতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
স্ত্রী এডিস মশার ডানার কম্পনের মতো শব্দ শুনে পুরুষ এডিস আকৃষ্ট হয়। এ ধারণা কাজে লাগিয়ে গবেষকেরা ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্টজের পরিবর্তনশীল শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করেছেন। যন্ত্রের ভেতরের পাখা মশাকে টেনে নেয়। এরপর আঠাযুক্ত পৃষ্ঠে আটকে পড়লে ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়। হলুদ পটভূমি ও নির্দিষ্ট আলো মশা শনাক্তে সহায়তা করে।
ছবিগুলো সার্ভারে পাঠানোর পর ‘ইওলোভি১১’ এআই মডেল এডিস ও অন্য মশা শনাক্ত করে। তবে যন্ত্রটি মূলত পুরুষ এডিসকে আকর্ষণ করে, আর ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ায় স্ত্রী এডিস। গবেষকদের মতে, পুরুষ এডিসের উপস্থিতিও কোনো এলাকায় এডিসের বিস্তার শুরুর প্রাথমিক সংকেত হতে পারে।
নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় প্রতিবার ৩০টি এডিস ও ৩০টি কিউলেক্স মশা রাখা হয়েছিল। সেখানে শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করা যন্ত্রটি নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তুলনায় গড়ে পাঁচ গুণ বেশি এডিস ধরেছে। শব্দ ব্যবহার করা যন্ত্রে ধরা মশার ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল এডিস।
তিন দিনের মাঠ পরীক্ষায় বৃষ্টি, বাতাস ও শহুরে শব্দের মধ্যেও যন্ত্রটি সচল ছিল এবং সার্ভারে তথ্য পাঠিয়েছে। কোনো পটভূমির বস্তু ভুল করে মশা হিসেবে শনাক্ত হয়নি। তবে বাতাসে উড়ে আসা ময়লা ও বৃষ্টির ফোঁটা ছবিতে বাধা তৈরি করেছে। গবেষকেরা তাই মাঠপর্যায়ের আরও ছবি দিয়ে এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ এবং শনাক্তকরণে অতিরিক্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা যোগ করার পরিকল্পনা করছেন।
খন্দকার আশফাকুল মুঈদ বলেন, ‘স্ত্রী মশা যেভাবে শব্দ করে, পুরুষ মশা সেভাবে করে না। এ শব্দ তারা করে মূলত পাখার মাধ্যমে। আমরা স্ত্রী মশার শব্দ সংগ্রহ করেছি। এ যন্ত্রে সেই শব্দ বাজতে থাকবে। দূর থেকে, এমনকি মুঠোফোনের মাধ্যমে এর গতিবিধি আমরা দেখতে পাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই যন্ত্রে এমনভাবে প্রোগ্রাম ঠিক করা হয়েছে, যাতে অন্য কোনো পোকা বা মশা নির্দিষ্ট করা যায়। তাতে অন্য উপকারী পোকা মারা যাবে না।’
গবেষণাপত্র অনুযায়ী, যন্ত্রটির যন্ত্রাংশের খরচ ৯৯ মার্কিন ডলার। দূরবর্তী সার্ভার ব্যবহারে মাসে আরও প্রায় ১৩ ডলার ৫০ সেন্ট ব্যয় হয়। একাধিক যন্ত্র একই সার্ভারে যুক্ত হলে প্রতিটি যন্ত্রের সার্ভার খরচ কমতে পারে।
২০২৭ সালের জুন-জুলাইয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি যন্ত্র বসিয়ে বড় পরিসরে মাঠ পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদের। দীর্ঘ সময় ও ভিন্ন পরিবেশে পরীক্ষা করে যন্ত্রটির নির্ভরযোগ্যতা এবং মশার উপস্থিতির সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকির সম্পর্ক যাচাই করা হবে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৩০৩ জন মারা গেছেন, আক্রান্ত হয়েছেন ৯৯ হাজার ২৭৫ জন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদেরা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস যন্ত্রটির ব্যয়, দেশীয় প্রযুক্তি, এআই ব্যবহার এবং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের সুবিধাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘কাজটি নতুন। এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও কোনো সহযোগিতা বা পরামর্শের প্রয়োজন হলে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন তা করতে রাজি আছে। সার্বিকভাবে কাজটিকে স্বাগত জানাই।’
তবে গবেষণাটি এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্থানে সীমিত থাকায় বৃহত্তর পরিসরে এর কার্যকারিতা যাচাই প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গবেষকেরাও জানিয়েছেন, পরবর্তী ধাপে বড় আকারের মাঠ গবেষণার পাশাপাশি যন্ত্রটিতে আরও কিছু বিষয় সংযোজন করা হবে।
The post শব্দ দিয়ে আকর্ষণ করা হবে এডিস মশাকে, এআই দিয়ে হবে শনাক্তকরণ appeared first on Mohona Tv.
