হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিলারি সোয়াংক ঘোষণা দিয়েছেন যে, ৫২ বছর বয়সে তিনি তার তৃতীয় সন্তানের মুখ দেখতে চলেছেন। এই ঘোষণাটি ইতোমধ্যে দেরিতে মাতৃত্ব বা পঞ্চাশের কোঠায় গর্ভধারণের বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। অস্কারজয়ী এই তারকা সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে একটি দারুণ ও সৃজনশীল ভিডিওর মাধ্যমে এই সুসংবাদটি শেয়ার করেছেন।
ভিডিওটিতে দেখা গেছে, তার স্বামী ফিলিপ স্নাইডার এবং তাদের তিন বছরের যমজ সন্তান একসঙ্গে অন্ধকার ঘরে শরীরে গ্লো স্টিক লাগিয়ে নেচে বেড়াচ্ছেন। এর মাঝেই হিলারির বেবি বাম্পে একটি ছোট্ট জ্বলজ্বলে শিশুর ছবি ফুটিয়ে তুলে এই গর্ভাবস্থার কথা জানানো হয়। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘অনেকেই জানতে চেয়েছেন আমি এর পরে কোন প্রজেক্টে কাজ করছি, এটি ডিসেম্বরে মুক্তি পাচ্ছে।’
এর আগে ২০২৩ সালের এপ্রিলে, ৪৮ বছর বয়সে হিলারি যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। দেরিতে মাতৃত্ব লাভ করা নিয়ে তিনি এর আগেও খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, তার গুছিয়ে ওঠা ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিগত পরিপক্বতা তাকে আরও বেশি ধৈর্যশীল ও মনোযোগী মা হতে সাহায্য করেছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, পঞ্চাশের কোঠায় গর্ভধারণ কম বয়সের গর্ভাবস্থার চেয়ে বেশ আলাদা। এই বয়সে ঝুঁকিগুলো কী কী, চিকিৎসকের নিয়মিত নজরদারি কেন জরুরি এবং বিকাশমান শিশুর ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে—সেসব বিষয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেরিতে গর্ভধারণ কীভাবে মায়ের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে?
পঁয়ত্রিশ বছরের পরের গর্ভধারণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যাডভান্সড ম্যাটারনাল এজ’ বা বয়সি মাতৃত্ব বলা হয়। একজন নারীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য, উর্বরতার ইতিহাস এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে চল্লিশ বা পঞ্চাশের কোঠায় এই ঝুঁকিগুলো আরও বেড়ে যেতে পারে। দেরিতে গর্ভধারণের সঙ্গে জড়িত প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লামসিয়া: বয়সি গর্ভবতী নারীদের গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। কিছু ক্ষেত্রে এটি প্রি-এক্লামসিয়ায় রূপ নিতে পারে, যা একটি বিপজ্জনক অবস্থা এবং এর ফলে কিডনি ও লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি খিঁচুনি, স্ট্রোক কিংবা সময়ের আগেই প্রসবের কারণ হতে পারে। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং চিকিৎসকের কড়া নজরদারিতে থাকা ভীষণ জরুরি।
২. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস: গর্ভাবস্থায় শরীর যখন রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিকভাবে সামলাতে পারে না, তখন এই জটিলতা দেখা দেয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষ করে ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা বদলে যাওয়ার কারণে। রক্তে শর্করা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে শিশুর আকার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে যেতে পারে, যা প্রসবকে কঠিন করে তোলে এবং অন্যান্য জটিলতা তৈরি করে। যাদের এই সমস্যা হয়, তাদের পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
৩. গর্ভধারণে জটিলতা: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমতে থাকায় প্রাকৃতিকভাবে উর্বরতাও হ্রাস পায়। পঞ্চাশের কোঠায় স্বাভাবিক উপায়ে গর্ভধারণ খুব একটা দেখা যায় না, বিশেষ করে মেনোপজের পর তো নয়ই। তবে কিছু নারী পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে চিকিৎসকদের সহায়তায় গর্ভধারণ করতে পারেন। কিন্তু উর্বরতার চিকিৎসা মানেই গর্ভাবস্থার সব ঝুঁকি দূর হয়ে যাওয়া নয়; তাই গর্ভধারণের আগেই সঠিক কাউন্সেলিং ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
৪. গর্ভপাত ও মৃত সন্তান প্রসবের বাড়তি ঝুঁকি: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গর্ভ হারানোর আশঙ্কাও বাড়ে। এর অন্যতম একটি কারণ হলো ডিম্বাণুতে ক্রোমোজমের ত্রুটির ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া, যা ভ্রূণের প্রাথমিক বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। এ ছাড়া আগে থেকেই কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে তা গর্ভাবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই যারা দেরিতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেন, তাদের উর্বরতা, বিভিন্ন স্ক্রিনিং এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিত।
৫. সিজারিয়ানের উচ্চ সম্ভাবনা: বয়সি নারীদের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের প্রয়োজনীয়তা বেশি দেখা দেয়—বিশেষ করে যদি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো জটিলতা থাকে। অনেক সময় প্রসবের প্রক্রিয়া ধীরগতির হয় কিংবা শিশুর ভুল অবস্থানের কারণে স্বাভাবিক প্রসব কঠিন হয়ে পড়ে। প্রসবের পদ্ধতি মূলত নির্ভর করে মায়ের স্বাস্থ্য, শিশুর শারীরিক অবস্থা এবং প্রসবের অগ্রগতির ওপর।
৬. অসময়ে প্রসব ও প্রসবোত্তর জটিলতা: বেশি বয়সে গর্ভধারণের সঙ্গে ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রসব হওয়ার ঝুঁকির যোগসূত্র রয়েছে। এ ছাড়া মায়ের অতিরিক্ত রক্তপাত, দেরিতে সুস্থ হয়ে ওঠা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতার মতো প্রসবোত্তর জটিলতার ঝুঁকিও বাড়ে।
৭. নিয়মিত চিকিৎসাসেবার গুরুত্ব: যারা দেরিতে মা হন, তাদের গর্ভাবস্থার পুরো সময়জুড়েই খুব কাছ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। চিকিৎসকরা নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, রক্তচাপ ও গ্লুকোজ পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান এবং ক্রোমোজোমজনিত ত্রুটির জন্য প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
দেরিতে গর্ভধারণ শিশুর ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে?
বয়সি মাতৃত্বের কারণে ডাউন সিনড্রোমের মতো ক্রোমোজোমজনিত সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণু তৈরির প্রক্রিয়ায় ত্রুটি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে। এ ছাড়াও গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, সময়ের আগেই জন্ম এবং কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। মায়ের যদি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দেখা দেয়, তবে শিশু অনুমানের চেয়েও বড় হয়ে জন্ম নিতে পারে, যা প্রসবের সময় জটিলতা বাড়িয়ে দেয়। অপরিপক্ব বা প্রি-ম্যাচিওর শিশুদের ফুসফুস, মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ার কারণে বিশেষ ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, এই প্রতিকূলতাগুলোই শেষ কথা নয়; বয়সি মায়েদের ঘরে জন্ম নেওয়া বহু শিশুই সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে। নিয়মিত চেকআপ, সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করলে চিকিৎসকরা যেকোনো সম্ভাব্য সমস্যা আগে থেকেই চিহ্নিত করে তা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারেন।