দিনটা চার মেরে শুরু করেছিলেন লিটন দাস, চার মেরেই ছুঁয়েছেন সেঞ্চুরি। ধারাভাষ্যকক্ষ থেকে দুবারই যেসব কথাবার্তা ভেসে এল, তার মর্মার্থ—কী সুন্দর শট! লিটন যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন, ধারাভাষ্যকারদের কথায় এমন মুগ্ধতা ঝরল বারবারই।
লিটনের বড় ইনিংস মানেই ব্যাটিং সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে থাকার সুযোগ, তাঁকে দর্শকদের প্রশংসায় ভাসানো। তবে সব সময়ই যে লিটন সে রকম খেলতে পারেন, তা নয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজে যেমন তিন ইনিংসেই আউট হয়েছেন শূন্য রানে।
আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে তাই এক রান করেই শূন্য ডিঙানোর রসিকতায় ব্যাট উঁচিয়ে ধরেছিলেন লিটন। সেই ইনিংসটা ৫৩ রানে থেমে গেলেও দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি পেয়ে ব্যাটের সঙ্গে আজ তিনি উঁচিয়ে ধরেন হেলমেটও।
টেস্টে রানে ফেরার স্বস্তিটা টের পাওয়া গেছে দিন শেষে লিটনের কথায়, ‘টেস্ট ক্রিকেটের মর্যাদা একটু ওপরে। কারণ, এই সংস্করণে অনেক কিছু হয়। প্রথম দিন থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত অনেক চ্যালেঞ্জ থাকে আর উপভোগ করার মতো পরিস্থিতিও থাকে।’
লিটনের সেঞ্চুরির সুবাদে আবুধাবি টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে আফগানিস্তানের সামনে ৪৭৯ রানের লক্ষ্য দিয়েছে বাংলাদেশ। আজ চতুর্থ দিন শেষে ৩ উইকেটে তারা করতে পেরেছে ১৩২ রান।
গতকাল তৃতীয় দিন শেষ বিকেলে ৫ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে একটু চাপেই পড়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। গতকাল লিটন ৫ আর মেহেদী হাসান মিরাজ শূন্য রানে দিন শুরু করে দলের ইনিংসটা এগিয়ে নেন একটু একটু করে। লিটনের ব্যাটেই রানের চাকা সচল ছিল বেশি। পঞ্চাশ পেরোতে খেলেছেন ৬১ বল। এর মধ্যেই বাংলাদেশের লিডও চার শ ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সাড়ে চার শ রানের লিড পেরোনোর পরও ইনিংস ঘোষণা করেননি অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। তখনো অপেক্ষা লিটনের সেঞ্চুরি আর মিরাজের ফিফটির জন্য।
দ্বিতীয় সেশনের মাঝামাঝি সময়ে ফিফটি পেয়ে যান মিরাজ, লিটনের সেঞ্চুরি পূর্ণ হয় এর পরের ওভারে। অবশ্য তিনি তিন অঙ্কে পৌঁছানোর পরও রান আরও কিছু বাড়িয়ে নিতে চাইছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেঞ্চুরি করার পরের ওভারেই মোহাম্মদ সেলিমের বল পুল করতে গিয়ে ক্যাচ দেন লিটন। এরপরই ড্রেসিংরুম থেকে ইনিংস ঘোষণার সংকেত আসে।
আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ের শুরুতে মনে হচ্ছিল, খেলাটা গতকালই শেষ হয়ে যায় কি না! প্রথম ইনিংসে হ্যাটট্রিকসহ ৫ উইকেট পাওয়া হাসান মাহমুদ আর ৪ উইকেট পাওয়া ইবাদত হোসেন এই ইনিংসেও আফগানদের শুরুটা নাড়িয়ে দেন। ইনিংসে নিজের প্রথম বলেই আবদুল মালিককে উইকেটকিপার লিটনের ক্যাচ বানান ইবাদত, টেস্টে বাংলাদেশের মাত্র পঞ্চম পেসার হিসেবে পূর্ণ করেন ৫০ উইকেট।
আগের ইনিংসেই বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সে মাইলফলকে দ্রুততম সময়ে পৌঁছানোর রেকর্ড গড়া হাসান মাহমুদ নেন পরের উইকেটটি। শহিদুল্লাহ কামালও ক্যাচ দেন লিটনেরই হাতে। চা–বিরতির আগেই ১৫ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ফেলে আফগানিস্তান। তবে শেষ সেশনে বাংলাদেশ উইকেট নিতে পেরেছে মাত্র একটি। সেদিকুল্লাহ আতাল আর রহমত শাহর জুটিতে এ সময় বাংলাদেশের অপেক্ষাটা বেশ দীর্ঘই মনে হচ্ছিল । তিন স্পিনারের কেউই যখন ব্রেক থ্রু দিতে পারছিলেন না, তখন আবারও ত্রাতা পেসার ইবাদত।
প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা আফগান অধিনায়ক রহমত (৫১) অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা মারতে গিয়ে কট বিহাইন্ড হয়ে যান। এ ম্যাচেই টেস্টে সপ্তম সেঞ্চুরি পাওয়া লিটন ক্যাচটা নিয়ে বাংলাদেশের হয়ে এক টেস্টে সবচেয়ে বেশি ডিসমিসালের রেকর্ডও গড়ে ফেলেন। ২০০৪ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খালেদ মাসুদের ৭ ডিসমিসালের রেকর্ড টপকে আবুধাবি টেস্টে তাঁর ডিসমিসাল গতকাল পর্যন্ত ৮টি।
আজ শেষ দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ৭ উইকেট আর আফগানিস্তানের ৩৪৭ রান। মহানাটকীয় কিছু না ঘটলে এই টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। তবে তার জন্য পেসারদের সঙ্গে বল হাতে কিছু করতে হবে স্পিনারদেরও। এখন পর্যন্ত দুই ইনিংস মিলিয়ে আফগানিস্তানের ১৩ উইকেটের মাত্র একটিই নিতে পেরেছে তারা।
লিটন অবশ্য আশাবাদী স্পিনারদের নিয়ে, ‘উইকেট স্পিনারদের খুব একটা সাহায্য করছে না। তবে পঞ্চম দিনে অনেক সময় উইকেটের অমসৃণ জায়গা থেকে অনেক বল বাঁক নেয়। আমাদের স্পিনাররা এরই মধ্যে ভালো জায়গায় বল করতে শুরু করেছে।’
