রাজধানীর পূর্বাচলসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিংয়ে এক অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে মাদক ও মদের আড্ডায় কারা, কী উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছিলেন, তা নিয়ে রহস্য কাটছে না। সেখানে এশিয়াটিকের অন্তত ২০ জন কর্মকর্তাসহ গ্রামীণফোন, বিএটি, প্রাণ-আরএফএল, ফিলিপ মরিস ও এসিআই মটরসের পদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল বলে জানা গেছে।
বিপুলসংখ্যক করপোরেট কর্মকর্তার এক বাড়িতে জড়ো হওয়াকে কাকতাল বলে মানতে নারাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দারা। তাদের ধারণা, এর পেছনে থাকতে পারে ষড়যন্ত্র।
পুলিশ জানায়, বাড়িটি মঙ্গলবার ওএসডি হওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের। এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া বাড়িটিতে সোমবার রাতে অভিযান চালায় ডিবি। অভিযান বন্ধে জহির বিভিন্ন মহলে তদবির করলেও তা উপেক্ষা করে অভিযান অব্যাহত রাখে গোয়েন্দা পুলিশ।
অভিযানে ৫৯ পুরুষ ও ২৬ নারীসহ মোট ৮৫ জনকে আটক করা হয়। পরে মোবাইল কোর্ট তাদের পুরুষদের এক মাস ও নারীদের ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা করে জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে পুরুষদের আরও তিন দিন ও নারীদের তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মঙ্গলবার তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ২৬ জনকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া হয়, বাকিরা রয়েছেন কেরানীগঞ্জে।
অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে কারা, কী উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছিলেন, তা জানাতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, আটক ব্যক্তিদের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে তাদের পেশা বা জড়ো হওয়ার উদ্দেশ্য জানা যায়নি। সাজাপ্রাপ্তদের নাম-পরিচয় প্রকাশ কিংবা তালিকা দিতেও রাজি হয়নি ডিবি।
পরে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তালিকায় দেখা যায়, গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি), প্রাণ-আরএফএল, ফিলিপ মরিস ও ইয়ামাহার মোটরসাইকেল সংযোজনকারী ও পরিবেশক এসিআই মটরসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদস্থ কর্মকর্তারা ওই বাড়িতে জড়ো হয়েছিলেন। তবে তালিকায় অনেকেই পেশা ও ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেননি। কেউ কেউ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে আটক ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।
তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের বিস্তারিত পরিচয়, পেশা, সেখানে জড়ো হওয়ার উদ্দেশ্য, সেখানে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড ছিল কি না তা খতিয়ে দেখছে।
খিলক্ষেত থানার ওসি আব্দুল আলীম বলেন, ডিবি কাউকে থানায় হস্তান্তর করেনি। মোবাইল কোর্টে সাজা ও জরিমানার পর ডিবির তত্ত্বাবধানে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা বা জিডি হয়নি।
রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গত ১২ অক্টোবর পল্লবী ও বনানী থেকে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, তারা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। পরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের জন্য তহবিল সংগ্রহ, উসকানিমূলক প্রচার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। তাদের সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে রহস্যময় বৈঠকের সঙ্গে গুলশান আরা ও দেবাশীষের কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দাদের একাধিক ইউনিট।
এদিকে, অভিযান পরিচালনা করা বাড়িটি এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলার প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত থাকলেও আবাসিক হোটেল বা রিসোর্ট হিসেবে অনুমোদন এবং বার-রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স ছিল না। ফলে সেখানে অবৈধভাবে চলছিল বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের দাবি, জন্মদিন ও গায়ে হলুদের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানে উঠান ভাড়া দেওয়া হতো। তবে ডিবির অভিযান অনুযায়ী, বাড়িটিতে প্রতি মাসে ২০-২২টি ডিজে পার্টি বসত, যেখানে নিয়মিত মাদক ও মদের আসর চলত।
গত মঙ্গলবার আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের স্বাক্ষরিত আদেশে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে ওএসডি করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ি নির্মাণ ও জমি কেনার অর্থের উৎস খতিয়ে দেখছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। বাড়িটি ভাড়া নিয়ে দেশি-বিদেশি অনেকে রাতযাপন ও পার্টি করতেন বলেও জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় সাড়ে ছয় কাঠা জমির ওপর নির্মিত তিনতলা বাড়িটি অনলাইনে ‘এয়ারবিএনবি’ অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। জহির বাড়িটি পরিচালনার জন্য মাহবুব আলম নামে একজনকে ‘কো-হোস্ট’ হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, ওই বাড়ি থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার ৭০ শতাংশ টাকা জহিরের অ্যাকাউন্টে জমা হতো এবং অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ মাহবুব নিতেন।
অভিযান পরিচালনাকারী ডিবি উত্তরা বিভাগের ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, বাড়িটিতে নিয়মিত ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলত। এসব আয়োজনে এশিয়াটিক, গ্রামীণফোন, প্রাণ-আরএফএল ও এসিআই মটরসসহ বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি ছিল।
পাঁচ কক্ষের বাড়িটিতে প্রতি রুমে ১০ জন পর্যন্ত ভাড়া নিতেন আয়োজকেরা। অতিরিক্ত প্রত্যেকের জন্য নেওয়া হতো ৬০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি। দুপুর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত চলা এসব আয়োজনে মাসে ১৮-২০টি অনুষ্ঠান হতো, প্রতিটি থেকে মিলত লাখ টাকা ভাড়া। তল্লাশিতে গাঁজা, ইয়াবা, মদ ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
