সবে শেষ হয়েছে সন্ধি পুজো। সোমবার ততক্ষণে পড়ে গিয়েছে মহানবমী। ঘড়ির কাঁটায় পার হয়ে গিয়েছে সকাল আটটা। আর ওই সময়ই পুরুলিয়ার বান্দোয়ান থানায় বেজে উঠল ঢাক। সঙ্গে আরও নানান বাদ্যযন্ত্র। খাকি উর্দি বা ক্যামোফ্লেজ পোশাকে পুজোর ডিউটি নয়। বরং একেবারে সাদা ধবধবে ধুতি, গেঞ্জি গায়ে জড়িয়ে গলায় গামছা নিয়ে রীতিমতো উপোস থেকে একেবারে অন্য ভূমিকায় থানার ওসি।
নয় দশক ধরে পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের দুর্গাপুজোর রীতির সঙ্গে যে এভাবেই জড়িয়ে রয়েছেন ওই থানার অফিসার ইনচার্জ। তাই ৯১ বছরেও এদিন মহাঅষ্টমীর সন্ধি পুজো শেষে সেই নিয়ম, রীতি, আচারের পরিবর্তন হল না। বান্দোয়ান থানার ওসি যেই থাকুন পদাধিকার বলে তিনি এখানকার দুই পুজোর বলিদানের তরোয়ালকে গামছা দিয়ে মুড়ে শান্তির বার্তা দেন। এবারও সকালে বান্দোয়ান থানার ওসি মৃন্ময় ভক্ত-র হাত ধরে সেই ছবি দেখল বনমহল বান্দোয়ান।
আর সেই রীতি পালনে এক এক করে বান্দোয়ানের দুই পুজো কমিটি পুরাতন সর্বজনীন দুর্গা পুজা কমিটি ও নব দুর্গা সর্বজনীন কমিটির কর্মকর্তা থেকে সদস্যরা একেবারে ঢাক ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে থানায় প্রবেশ করলেন। অথচ এন্ট্রি পোস্টে থাকা পুলিশ কর্মী কোনও প্রশ্ন করলেন না। সকাল থেকেই বান্দোয়ানের সদর দরজা খুলে দেওয়া হয়। আসলে বলিদানের তরোয়ালের ‘উগ্রতা’ কমাতেই থানায় পা রাখেন ওই দুই পুজো আয়োজকরা। ওই সাড়ে তিন ফুটের তরবারি দিয়ে যেন কোনওভাবেই রক্ত না ঝরে! ধর্মীয় ভাবাবেগকে কোনরকম আঘাত না দিয়ে এই প্রথার মধ্য দিয়েই পুজোর মধ্যে থানার ওসির এমন শান্তির বার্তা রাজ্যে রীতিমত নজির।
বান্দোয়ানের পুরাতন সর্বজনীন দুর্গা পুজা কমিটির কর্মকর্তারা জানান, তাদের পুজোয় কোনওদিন প্রাণী হত্যা ছিল না। একেবারেই প্রথম থেকে চালকুমড়ো ও আঁখ বলি হয়ে থাকে। যে তরোয়াল দিয়ে ওই বলি দেওয়া হয় সেই তরোয়াল তারা প্রশাসনের কাছে অর্থাৎ বান্দোয়ান থানায় নিয়ে আসেন। ওই থানার ওসি সেই তরোয়ালকে লাল গামছা দিয়ে মুড়ে উগ্রতা কমিয়ে দেন। ছড়ান শান্তির বার্তা।
বান্দোয়ান পুরাতন সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি ভেঙে ২০১১ সাল থেকে নবদুর্গা বান্দোয়ান সর্বজনীন কমিটি নামে বান্দোয়ান ব্লক সদরে আরও একটি পুজো হচ্ছে। তারাও একইভাবে বলিদানের তরোয়াল থানায় ওসির হাতে তুলে দেন। তা লাল গামছায় মুড়ে দেন থানার অফিসার ইনচার্জ। এই ছবি দেখতে বান্দোয়ান থানায় এদিন ভিড় জমে যায়। কিন্তু বাধা দেয় না কোনও পুলিশ। থানায় আসা ওই শোভাযাত্রায় থাকেন দুই পুজো কমিটির পুরোহিত, কর্মকর্তা থেকে বাদকরা। এই রীতিতে ফুটে ওঠে শক্তি থাক। কিন্তু তার ব্যবহার হোক সংযত। আর সেই বার্তায় ওসির আইনের শাসন নয়। পুজোর আচারে শান্তির আবাহন।
