সরকার পরিবর্তন হলেও বহাল তবিয়তে রয়ে যান কিছু প্রভাবশালী অপরাধী ও সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী। স্বর্ণ ও হীরা চোরাচালান, জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার রহস্যজনক কারামুক্তি ও ক্ষমতার অলিন্দে পুনরাসীনতা দেশের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার ওপর এক প্রকট প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে। ক্ষমতার পালাবদলে খোলস পাল্টানোর এক নিখুঁত কারিগর ছিলেন দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির এই নেতা ২০২৪ সালের ‘আমি ও ডামি’ খ্যাত বিতর্কিত নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন। তবে ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পরপরই তার রাজনৈতিক রঙ বদলাতে সময় লাগেনি। আওয়ামী ক্ষমতার আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে তিনি রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলে যে বিশাল প্রভাববলয় তৈরি করেছিলেন, ক্ষমতা পরিবর্তনের পর সুবিধাপ্রাপ্তির লোভে তিনি বিএনপিতে ভিড়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠে এবং শেষমেশ নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে সফল হতে চলছেন।
দিলীপ কুমার আগরওয়ালার অপরাধের তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ ও ভয়াবহ। বিগত দুই দশক ধরে খাঁটি ডায়মন্ডের নামে উন্নতমানের কাচের টুকরা বিক্রি করে সাধারণ ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা, দুবাই-সিঙ্গাপুর সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, এবং হুন্ডির মাধ্যমে ভারত, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাইয়ে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি গড়ার প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেনের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে ১১২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও ৭৫৫ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে আসে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের ডজনখানেক মামলা, হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ এবং বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অনুসন্ধান চলা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হওয়ার পর কারাগারের দিনগুলোতে তিনি হাসপাতাল কেবিনে রাজকীয় ভিআইপি সুবিধা ভোগ করেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জামিন পাওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় ৩০ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কঠোর গোপনীয়তায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কোনো গোয়েন্দা রিপোর্ট না থাকা, বিশেষ শাখার নীরবতা এবং তড়িঘড়ি জামিননামা পৌঁছানোর ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার কলকাঠি নাড়ার তীব্র অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এত গুরুতর অপরাধ, অর্থ পাচার ও অসংখ্য মামলার বোঝা মাথায় নিয়েও সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের উপস্থিতিতে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের শারদীয় দুর্গোৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার মতো বিতর্কিত ব্যক্তির প্রকাশ্য উপস্থিতি প্রমাণ করে যে আইনের শাসন আজও কতটা দুর্বল ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। ক্ষমতার শীর্ষমহল বা রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও ছাড় ব্যতীত এমন একজন আসামির এত দ্রুত মুক্তি পাওয়া এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অপরাধীদের এমন দেদারসে বেরিয়ে আসা এবং প্রকাশ্য সমাদর জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে। দিলীপ আগরওয়ালার এই রহস্যজনক ও নিয়মবহির্ভূত কারামুক্তির নেপথ্যে রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক পর্যায়ে কারা জড়িত ছিল, তা উদঘাটনে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। যেসব মামলায় তাকে তড়িঘড়ি জামিন দেওয়া হয়েছে, তা পুনর্বিবেচনা করে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে তার মুক্তি স্থগিত বা বাতিল পূর্বক দুদক ও সিআইডির মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি না করলে বিপুল অর্থ পাচারের পথ বন্ধ হবে না। একই সাথে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার শো-রুমসহ বিদেশে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, নতুবা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার এই চর্চা আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে থাকবে।
