মান নিয়ন্ত্রণে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি বিবেকের শুদ্ধতা জরুরী। পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকী এবং উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের নৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ রফিকুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার মোঃ জেদান আল মুসা, পিপিএম।
তাঁরা বলেছেন, পণ্যের মান রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারীর পাশাপাশি ব্যক্তিগত সততা ও বিবেকের শুদ্ধতাও জরুরী। একই সঙ্গে জেলার যেসব বেকারীর প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কাগজপত্র নেই বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দিনাজপুর বেকারী মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ সাইফুল্লাহ।
আজ বুধবার (১৪ অক্টোবর) ৫৭তম বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষে দিনাজপুর জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), দিনাজপুরের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
এবারের প্রতিপাদ্য ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানী’। আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘Shared Vision for a Better World’-এর আলোকে মানসম্মত পণ্য ও সেবা, ভোক্তার অধিকার, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানীর গুরুত্ব আলোচনায় উঠে আসে।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কাঞ্চন-১ সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, আলোচনা সভায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবার ও সমাজের অন্যদের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে। এতে মান সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষও উপকৃত হবে।
মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, বাংলা ভাষার নিজস্ব মান, সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। এ মর্যাদা রক্ষায় বাঙালীদের সচেতন ও দায়ীত্বশীল হতে হবে। তিনি বাংলা ভাষায় কথা বলার সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইংরেজি শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে মাতৃভাষার যথাযথ চর্চার ওপর গুরুত্ব দেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মোঃ জেদান আল মুসা, পিপিএম পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মান নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত মান বজায় রাখা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত তদারকী অপরিহার্য।
বিএসটিআইয়ের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি পণ্যের গায়ে বাংলাদেশী মান নির্দেশক বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন এবং আন্তর্জাতীক মানের ক্ষেত্রে আইএসওর মতো স্বীকৃত ব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, পণ্যের মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে পুলিশ সুপার বলেন, “যতদিন বিবেকের মান ঠিক না হবে, ততদিন কোনো কিছুর মান ঠিক হবে না।” তিনি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বজায় রাখার বিষয়ে পবিত্র কোরআনের শিক্ষার প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর মতে, খাদ্যে ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য মানুষের স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতিকর প্রভাব ব্যক্তি ও সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর পড়ে। তাই ভেজাল প্রতিরোধ ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার দায়ীত্বশীল হওয়া জরুরী।”
সভায় দিনাজপুর বেকারী মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ সাইফুল্লাহ জেলার কিছু বেকারীর অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জেলায় এমন কিছু বেকারী রয়েছে, যেগুলোর বিএসটিআই সনদ নেই এবং বেকারী পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারী কাগজপত্রও সম্পূর্ণ নয় বলে তাঁর জানা রয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি জনস্বাস্থ্য ও ভোক্তাস্বার্থে অভিযোগগুলো যাচাই করার আহ্বান জানান।
তাঁর বক্তব্য, বেকারী পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত বিধিবিধান ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সব বেকারী মালিককে বিধি মেনে ব্যবসা পরিচালনায় বাধ্য করতে হবে।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের অধ্যাপক ড. হাবিবা খাতুন এবং দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোঃ গোলাম রসুল রাখি। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ আবু বকর ছিদ্দীক এবং বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক। উপপরিচালকও সভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস.এম. হাবিবুল হাসান। সভায় বিভিন্ন সরকারী দপ্তরের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ব মান দিবসের আলোচনায় বক্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায়ীত্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িত উৎপাদক, ব্যবসায়ী, তদারককারী সংস্থা এবং ভোক্তা-সব পক্ষের সচেতনতা ও দায়ীত্বশীলতা। নিয়মিত বাজার তদারকী, আইনানুগ ব্যবস্থা, নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগই পারে নিরাপদ পণ্য ও সুস্থ সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে।
