নগরায়ণের প্রসার ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম রূপকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, যা ইজিবাইক বা টুকটুক নামেও পরিচিত। প্রচলিত পায়ে চালানো রিকশাকে সরিয়ে দিয়ে তিন চাকার এই যান ধীরে ধীরে সড়কের অন্যতম বাহন হয়ে উঠেছে। শুরুর দিকটায় গ্রামীণ ও শহরতলি এলাকাতেই ছিল এর বিচরণ। তবে গত দুই বছরে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্য বড় শহরগুলোর সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাকে একরকম দখলেই নিয়ে নিয়েছে বলা যায়। কম খরচে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা নিয়ে এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। যাতায়াতের সুবিধার এই দিকটি বাদ দিলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আছে বহু ক্ষতিকর দিকও, যা সরাসরি নগর পরিবহন, জনজীবন ও জননিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং প্রকৃতিতে মিশ্র প্রভাব ফেলছে। তবে পুরোপুরি নির্মূল না করে কীভাবে এর সর্বোচ্চ ও টেকসই ব্যবহার করা যায় সেটাই এ প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়।
সম্পূর্ণ অযান্ত্রিক একটি বাহন থেকে যান্ত্রিক বাহনে এই যে রূপান্তর এর ভালো-খারাপ দুটি দিকই আছে। পায়ে চালিত রিকশায় চালকদের অমানবিক শারীরিক পরিশ্রম হয়, যা ব্যাটারিচালিত রিকশায় হয় না। ফলে বয়স্ক ও শারীরিক শক্তি কম থাকা চালকরাও স্বাচ্ছন্দ্যে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অন্যান্য পরিবহনের তুলনায় সহজলভ্য ও কিছুটা সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে যাতায়াতও সহজতর হয়েছে। এ ছাড়াও লাখ লাখ বেকার যুবক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বল্পপুঁজিতে তাৎক্ষণিক আয়ের ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে এই বাহন। জ্বালানি তেলের ব্যবহার না থাকায় বিষাক্ত ধোঁয়া বা কার্বণ নিঃসরণ করে না বিধায় অনেকে একে পরিবেশবান্ধব বলেও আখ্যায়িত করছেন।
নগর পরিবহন ব্যবস্থার মৌলিক নীতির আলোকেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করা সম্ভব।
একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহন ব্যবস্থার প্রধান শর্ত হলো সমন্বিত যাতায়াতকাঠামো। যেকোনো বড় শহরের গণপরিবহন (যেমন- বাস, ট্রাম বা মেট্রোরেল) সাধারণত মূল ধমনিসদৃশ সড়কগুলোতে বিস্তৃত থাকে। কিন্তু একজন নাগরিককে তার ঘর থেকে বাসস্ট্যান্ড কিংবা স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় দক্ষ ‘ফিডার সার্ভিস’। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অত্যন্ত সফলভাবে এই প্রান্তিক গতিশীলতা বা লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করেছে। নির্দিষ্ট সময়সূচির তোয়াক্কা না করে, কম খরচে এবং দ্রুত নাগরিককে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কারণে এটি সাধারণ মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কিন্তু নগর পরিকল্পনার নীতিমালার দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি নগর পরিবহনে চরম ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। একটি নিরাপদ সড়কের জন্য গাড়ির গতির সামঞ্জস্য বা স্পিড হোমোজেনিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বা প্রধান জেলা শহরগুলোর ধমনিসদৃশ সড়কগুলোতে (আর্টেরিয়াল রোড) যখন ঘণ্টায় ৪০-৬০ কিলোমিটার বেগে ধাবমান বাসের পাশাপাশি ২০-২৫ কিলোমিটার বেগের ব্যাটারি অটোরিকশা চলাচল করে, তখন ট্রাফিকের স্বাভাবিক প্রবাহ থমকে দাঁড়ায়। মহাসড়ক ও বড় সংযোগ সড়কগুলোতে অটোরিকশার অপরিকল্পিত প্রবেশের ফলে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। এর প্রধান কারণ চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক ড্রাইভিং শিক্ষার অভাব। এ ছাড়াও পর্যাপ্ত ব্রেকিং সিস্টেম না থাকা এবং যানের ওজনের তুলনায় ভারসাম্যহীন ডিজাইনের কারণে প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অটোরিকশা উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে কেবল ‘ট্রাফিক জ্যামের কারণ’ বা ‘অবৈধ যান’ হিসেবে দেখলে এর পেছনের বিশাল অর্থনৈতিক বাস্তবতা নজর এড়িয়ে যায়। মূলত এটি বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির (ইনফরমাল ইকোনমি) এক বিশাল ভিত্তি স্তম্ভ। দেশে বর্তমানে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভর করে জীবনধারণ করছে। শুধু ঢাকা মহানগরীতেই অটোরিকশার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে। কৃষি খাতের অদৃশ্য বেকারত্ব কিংবা কারখানার কম মজুরির কাজ ছেড়ে প্রতিদিন নগদ ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা নিশ্চিত আয়ের আশায় প্রান্তিক মানুষ এই পেশায় যুক্ত হচ্ছে। একটি অটোরিকশা কেনা বা তৈরি করতে খরচ হয় ৭০,০০০ থেকে ১,২০,০০০ টাকা। স্থানীয়ভাবে কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর কিংবা টঙ্গীর মতো শিল্প এলাকায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে অটোরিকশার বডি নির্মাণ, মোটর আমদানি, চাকা ও মেকানিক গ্যারেজ কেন্দ্রিক কোটি কোটি টাকার সমান্তরাল বাজার গড়ে উঠেছে। এটি একদিকে যেমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে গ্রামীণ ও শহরতলি এলাকায় নগদ অর্থ সরবরাহ সচল রেখেছে
অটোরিকশার সবচেয়ে বিতর্কিত ও সংবেদনশীল দিকটি সম্পর্কিত জাতীয় বিদ্যুৎ ও শক্তি ব্যবস্থার সঙ্গে। প্রতিটি অটোরিকশায় সাধারণত ৪-৫টি ১২ ভোল্টের সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়, যা পূর্ণ চার্জ দিতে দৈনিক ৪ থেকে ৬ ইউনিট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। সারাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ অটোরিকশা চার্জে বসানো হলে দৈনিক প্রায় ১.৫ থেকে ২ কোটি ইউনিট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়- যার পরিমাণ মেগাওয়াটের হিসাবে প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ মেগাওয়াটের সমতুল্য।
সমস্যাটি কেবল বিদ্যুৎ ব্যবহারে নয়, বরং বিদ্যুৎ বিতরণের প্রশাসনিক দুর্বলতায়। অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার জন্য গড়ে ওঠা হাজার হাজার গ্যারেজ অননুমোদিত এবং তারা আবাসিক বা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে কাজ চালায়। এর ফলে সরকার প্রতিবছর আনুমানিক ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার চেয়েও বড় সংকট হলো, অটোরিকশা চার্জে বসানো হয় মূলত সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে- যে সময়টি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ‘পিক আওয়ার’ (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়)। ফলে স্থানীয় ট্রান্সফর্মারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং গ্রাম ও উপশহরে ঘন ঘন লোডশেডিং এবং ট্রান্সফর্মার বিকল হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই অবৈধ চার্জিং হাবগুলো।
বাহ্যিকভাবে অটোরিকশা চলাচলের সময় কোনো ধোঁয়া নির্গমন করে না বলে একে আপাতদৃষ্টিতে ‘পরিবেশবান্ধব’ মনে হতে পারে। কিন্তু এর উৎপাদন ও বর্জ্য চক্র মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনছে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত অটোরিকশাগুলোর ৮০ শতাংশেরও বেশি সস্তা সিসা-এসিড ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোর আয়ু মাত্র ৬ থেকে ৯ মাস।
ফলে প্রতিবছর দেশে প্রায় ১,০০,০০০ টনেরও বেশি ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত সিসা-এসিড ব্যাটারি জমা হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে এই ব্যাটারিগুলো পুনর্ব্যবহারের কোনো সুনির্দিষ্ট ও নিরাপদ অবকাঠামো নেই। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বা ফসলি জমির পাশে খোলা জায়গায় কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই ব্যাটারি ভেঙে সিসা ও সালফিউরিক এসিড বের করা হয়। ফলে বায়ু, মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে বিষাক্ত সিসা ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিসা একটি মারাত্মক ভারী ধাতু, যা শিশুদের মানসিক ও স্নায়বিক বিকাশ চিরতরে পঙ্গু করে দেয় এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করে।
উদ্ভূত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন সুশৃঙ্খল নীতিমালা।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা শহর থেকে এক রাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। এটি লাখ লাখ মানুষের জীবিকা এবং কোটি মানুষের যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। সমাধান নিহিত রয়েছে সমন্বিত ও সুসংগঠিত নীতিমালার প্রয়োগে :
১. জোনভিত্তিক ডিজিটাল ড্রাইভিং ও রুট কোড : প্রধান সড়ক ও মহাসড়কে অটোরিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। কিন্তু শহরের ভেতরে এলাকা বা জোনভিত্তিক নির্দিষ্টসংখ্যক যানকে কিউআর কোডসহ ডিজিটাল নম্বর প্লেট এবং এলাকাভিত্তিক রঙের মাধ্যমে চলাচলের অনুমতি দিতে হবে।
২. লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে রূপান্তর : পরিবেশ ধ্বংসকারী সিসা-এসিড ব্যাটারির বদলে ৮০% কম বিদ্যুৎ খরচকারী ও দীর্ঘস্থায়ী ‘লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
৩. অফ-গ্রিড সোলার চার্জিং হাব : জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে গ্যারেজগুলোকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনা এবং সৌরশক্তিচালিত সোলার চার্জিং স্টেশন স্থাপনে নীতিগত প্রণোদনা দেওয়া দরকার।
৪. যান্ত্রিক আধুনিকায়ন ও প্রশিক্ষণ : বুয়েটের প্রকৌশলীদের দ্বারা নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ ডিজাইন প্রণয়ন করা এবং বিআরটিএর মাধ্যমে চালকদের মৌলিক ট্রাফিক নিয়মের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং প্রচ্ছন্ন বেকারত্বের চাপ- এই ত্রিবিধ সামাজিক বাস্তবতার হাত ধরেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিকাশ। নগর গণপরিবহনের ব্যর্থতা আর প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আজ এক স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক বিপ্লবে পরিণত হয়েছে। একে কেবল আইন প্রয়োগ করে বন্ধ করার চেষ্টা করলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটা স্বাভাবিক। প্রযুক্তির এই সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন প্রশাসনিক সদিচ্ছা, কারিগরি আধুনিকায়ন এবং সমন্বিত নগর পরিবহন নীতিমালা। তবেই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির এই বিশাল শক্তিকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও টেকসই নগর পরিবহনে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
তাসলিহা মওলা : স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ
মতামত লেখকের নিজস্ব
