ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষকে নতুন করে সামনে এনেছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্য দূর করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর ঢেউ আঘাত করছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থি রাজনীতিতেও।
২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই অস্থিরতা ফ্রান্সের রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর করেছে। একদিকে বামপন্থি নেতা জঁ-লুক মেলেনশঁ তরুণদের ক্ষোভকে সমর্থন দিচ্ছেন, অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থি নেত্রী মেরিন লো পেন আইনশৃঙ্খলা ও কর্তৃত্বের প্রশ্ন সামনে আনছেন। মাঝখানে চাপে পড়েছে ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক শিবির।
আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তরুণদের মধ্যে মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতি আগ্রহ কমে আসার ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে আসন্ন নির্বাচনে ফ্রান্সের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আশ্বাস দিলেও সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারীরা : সহিংস বিক্ষোভের পর রোববার রাতে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কথা স্বীকার করেন। একই সঙ্গে ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, যারা সম্পদ ধ্বংস করেছে, তাদের এর মূল্য দিতে হবে। লুটপাটকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের অনেকেই প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে সন্তুষ্ট হননি। তাদের অভিযোগ, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণা করেননি।
প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইভরি-সুর-সেন এলাকার ২০ বছর বয়সি তরুণ ইয়ানিস বলেন, প্রেসিডেন্টের ভাষণে নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই। পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
শিক্ষার দাবি থেকে রাজপথের ক্ষোভ : সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার দাবি জানান। কিন্তু দ্রুতই তা শিক্ষাঙ্গনের গ-ি পেরিয়ে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের প্রকাশে পরিণত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের দাবিগুলো ফ্রান্সের রাজনৈতিক আলোচনায় তুলনামূলক কম গুরুত্ব পেয়েছে। এর একটি কারণ নির্বাচনে তরুণদের কম অংশগ্রহণ। অন্যদিকে পেনশন ও বয়স্ক ভোটারদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো রাজনৈতিক প্রচারে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। প্যারিস দ্বাদশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন আইনের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেলিঘ নাবলির মতে, এবার প্রার্থীদের তরুণদের দাবির বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। শুধু আশ্বাস দিয়ে তাদের সমর্থন পাওয়া যাবে না।
মেলেনশঁর দিকে ঝুঁকছেন তরুণেরা : শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে জোরালো সমর্থন দিয়েছে জঁ-লুক মেলেনশঁর নেতৃত্বাধীন বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবো। শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির আবেদনপ্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত পারকুরসুপ ব্যবস্থা বাতিলের দাবি রয়েছে দলটির কর্মসূচিতে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি জনমত জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি ভোটারদের মধ্যে মেলেনশঁর প্রতি সমর্থন ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের তুলনায় এই সমর্থন বেড়েছে ১০ শতাংশ। তবে দলটির সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন, তারা রাজনৈতিক সুবিধা নিতে তরুণদের ক্ষোভকে কাজে লাগাচ্ছে। মেলেনশঁর সমর্থকদের কাছে অবশ্য বিষয়টি শুধু কট্টর ডানপন্থার বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থি নীতির প্রতিও হতাশার প্রকাশ। লুভর জাদুঘরে আয়োজিত এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সি শিক্ষার্থী লিডিয়া বলেন, মধ্যপন্থিরা ক্ষমতায় থাকলে ম্যাক্রোঁর নীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে তিনি মনে করেন।
আইনশৃঙ্খলা সামনে আনছেন লো পেন : অন্যদিকে মেরিন লো পেন ও তার দল ন্যাশনাল র্যালি বিক্ষোভের সহিংসতাকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তাদের বক্তব্য, সরকার দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। লো পেনের দাবি, ফ্রান্স এখন আস্থা ও কর্তৃত্বের গভীর সংকটের মুখে। তার মতে, সহিংসতা ও অসহায়ত্বের পরিস্থিতি দেশটির গণতন্ত্রের জন্য হুমকি তৈরি করছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জনমত জরিপে লো পেনের সমর্থন ৩২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও তার দলের অবস্থান দ্বিতীয়, মেলেনশঁর দলের পরেই। ফলে একই আন্দোলন থেকে দুই বিপরীত রাজনৈতিক শিবিরই সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। বামপন্থিরা সামাজিক বৈষম্য ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট সামনে আনছে, আর ডানপন্থিরা গুরুত্ব দিচ্ছে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নে।
আর্থিক সংকটেও বাড়ছে চাপ : ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। আগের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন শুরু হয়েছিল জ্বালানি কর বাড়ানোর প্রতিবাদে। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ধনীদের প্রতি সরকারের পক্ষপাতের অভিযোগও আন্দোলনে যুক্ত হয়। এবারের পরিস্থিতি আরও কঠিন। কারণ, পরবর্তী সরকারের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করে মানুষের অসন্তোষ প্রশমিত করার সুযোগ সীমিত থাকবে।
গত বছর ফ্রান্সের মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় সরকারি বাজেট ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় ঘাটতি ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে নতুন প্রেসিডেন্টকে জনঅসন্তোষ না বাড়িয়ে সরকারি ব্যয় কমানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এদিকে ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তা নেমে এসেছে মাত্র ১৫ শতাংশে, যা তার রাজনৈতিক জীবনের সর্বনি¤œ পর্যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনের আগে নতুন সমীকরণ : সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠীকে দায়ী করলেও শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে নতুন কোনো নীতিগত পদক্ষেপ ঘোষণা করেননি ম্যাক্রোঁ; বরং প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। তবে এই উদ্যোগে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ কতটা কমবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিরোধী দলগুলোও বর্তমান পরিস্থিতিকে ম্যাক্রোঁ সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে দেখছে। ফ্রান্সের সংবিধান অনুযায়ী, দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করায় ম্যাক্রোঁ ২০২৭ সালের নির্বাচনে আর প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে সেই নির্বাচনে মধ্যপন্থি শিবিরের ভবিষ্যৎও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে ফ্রান্সে এখন লড়াই শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে নয়; বরং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার এবং নতুন প্রজন্মের সমর্থন অর্জন নিয়েও। তরুণেরা যদি প্রচলিত মধ্যপন্থি রাজনীতির বিকল্প খুঁজতে থাকেন, তবে আগামী নির্বাচনে বাম ও ডানÑ উভয় শিবিরেরই শক্তি বাড়তে পারে। তবে পরিবর্তনের দাবি জোরালো হলেও ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নিয়ে এখনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
