বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে গেছে। আপনারা সংবাদপত্রে দেখবেন যে এডিবিসহ অন্যান্য সংস্থা আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তা আগের চেয়ে অনেক কম।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া বা পরিণতি ভবিষ্যতের কোনো বিষয় নয়; বরং এটি এমন এক সমস্যা যার মুখোমুখি আমরা এ পৃথিবীতে সবাই এরই মধ্যে হয়ে গেছি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি যে সবসময় কেবল বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমেই আসবে, তা নয়। অতিরিক্ত গরমের কারণে কারখানায় শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। আবার বৃষ্টি অনিয়মিত হওয়ায় কৃষকের ফসল নষ্ট হয়। লবণাক্ততা আমাদের কৃষি জমি এবং পানীয়জলের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা কিংবা বন্যা—এগুলোর ক্ষতিকর দিক এখন আর অদৃশ্য নয়, বরং পুরোপুরি দৃশ্যমান।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে গেছে। আপনারা সংবাদপত্রে দেখবেন যে এডিবিসহ অন্যান্য সংস্থা আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তা আগের চেয়ে অনেক কম। একদিকে যেমন প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, তেমনি মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বিনিয়োগে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। আমাদের জ্বালানি খাতও বড় চাপের মুখে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবরের হালনাগাদ পূর্বাভাসে ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এটি অবশ্যই একটি পূর্বাভাস, চূড়ান্ত হিসাব নয়। তবে এ পূর্বাভাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় অর্থনীতির সহনশীলতা আরো বাড়াতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আমাদের এ অর্থনৈতিক চাপকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন—বন্যায় উৎপাদন অনেক কমে যেতে পারে, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। আবার বন্যায় শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে তা আমাদের রফতানি ও কর্মসংস্থানে বড় আঘাত হানতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন কী এবং এর ফলে আমাদের কী কী সমস্যা হতে পারে, সেগুলো আমরা সবাই জানি। এ সংকট থেকে আমরা পুরোপুরি মুক্তি পাব না। তবে প্রতিরোধ বা অভিযোজন ব্যবস্থা যদি ভালোভাবে করতে পারি, তবে ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
আমাদের অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো কৃষি। কৃষি কেবল খাদ্য উৎপাদনের খাত নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস, বাজারে স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা গভীরভাবে জড়িত। আমাদের দেশে সেচ ব্যবস্থা ভালো হলেও কৃষি এখনো মূলত আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি—উভয়ই ভবিষ্যতে আমাদের কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই সামনের দিনে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
দেশের ৪৬ শতাংশ মানুষ এখনো বিভিন্নভাবে কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল। যদিও জাতীয় জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র ১১ থেকে ১২ শতাংশ। ঐতিহাসিকভাবেই কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে বেশি ইনপুট বা উপকরণ ব্যবহার এবং কৃষি খাতকে মেকানাইজ (যান্ত্রিকীকরণ) করতে হয়। কিন্তু কৃষি যখন যান্ত্রিক হয়, তখন আবার অনেক মানুষের কর্মসংস্থান থাকে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ২০-২২ লাখ নতুন ছেলে-মেয়ে কর্মক্ষম হয়ে চাকরির বাজারে আসছে। অন্যদিকে কৃষি খাত থেকে অনেকে কাজ হারিয়ে চাকরির বাজারে আসছে। এবং আমাদের নারীরাও এখন আর ঘরে বসে থাকতে চান না। ফলে আমাদের বছরে ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান দরকার, যার জন্য বিপুল বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত ‘এল নিনো’। এবারের এল নিনোটি গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর হিসেবে দেখা যাচ্ছে। আমরা না চাইলেও ধারণা করা যায় যে আগামী এক-দুই বছর ঝড়-তুফান, অনাবৃষ্টি কিংবা অতিবৃষ্টি বেশি হবে। সেজন্য আমাদের অ্যাডাপ্টেশনের দিকে যেতে হবে, যাতে ক্ষয়ক্ষতি কম হয় এবং মানুষের জীবনযাত্রা পুরোপুরি ব্যাহত না হয়।
