পুজেরা সময় চাঁদার জুলুম আগের থেকে কমলেও একেবারে উধাও তা বলা যাবে না। অশোকনগরে চাঁদা অনাদায়ে হামলার অভিযোগ।
‘কে তুমি নন্দিনী…’, হালকা রঙ্গ ও রসিকতা-মাখা গান দিয়ে শুরু হয়েছিল পাড়ার নবাগত সুন্দরীকে কটাক্ষ করার পালা। শিক্ষিত ও আধাশিক্ষিত যুবকবৃন্দ, লেখাপড়া শিখে ও শেখার সুযোগ না পেয়ে, এক জটিল ‘সমাজব্যবস্থা’-র শিকার হয়ে পড়েছে, যেখানে তাদের জন্য অর্থকরী ‘কাজ’ নেই বাজারে। মোচ্ছবে-পার্বণে আনন্দ করার অছিলায় প্রায় তারা কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি করে ফেলে।
প্রথমত, তারা ভদ্রবিত্ত সমাজের অংশ হতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, তাদের বেকারত্বর প্রহর এত দীর্ঘ যে, অন্য কীভাবে সময় কাটাবে, জানে না। বাড়িতে যেটুকু না থাকলে নয়, সেটুকুই থাকে। এই যুবকদের নেতা মন্টু। নবাগত মেয়েটির প্রতি তাদের যা আচরণ, সেটি যে কার্যত ইভটিজিংয়ের নামান্তর, বোঝার বোধ মন্টু ও তার বন্ধুদের সম্ভবত নেই। একদিন সকালে, কাজে বেরনোর সময়, ফের মেয়েটির সঙ্গে দেখা হল মন্টুর। ‘দিদিমণি, টোলে যাচ্ছেন না কি?’ বলে ফের রসিকতা করল মন্টু। মেয়েটির নাম সরসী। সে এই ব্যবহারে যারপরনাই ক্ষুণ্ণ ও ব্যথিত হল। এরপর মন্টুরা একদিন গেল সরসীদের বাড়িতে চাঁদা কাটতে। তার দাদা কিন্তু ‘প্রান্তিক’ বলে মন্টুদের তাড়িয়ে দিল না। কুড়ি টাকা চাঁদা দিল। নতুন পাড়া, সেখানে পজিশন, সম্মান- সব যে এই চাঁদার অঙ্কে বাঁধা। পাড়ায় এর ফলে সরসীর দাদার সম্মান সত্যি বেড়েছিল কি না, তা জানা না গেলেও, এই সুবাদে সরসীদের বাড়িতে আসা-যাওয়ার সুযোগ ঘটে গেল মন্টুর জীবনে। সেখান থেকে সূত্রপাত ঘটল নতুন করে পথ চলার, সরসীর সঙ্গে।
শিক্ষিত ও আধাশিক্ষিত যুবকবৃন্দ, লেখাপড়া শিখে ও শেখার সুযোগ না পেয়ে, এক জটিল ‘সমাজব্যবস্থা’-র শিকার হয়ে পড়েছে, যেখানে তাদের জন্য অর্থকরী ‘কাজ’ নেই বাজারে। মোচ্ছবে-পার্বণে আনন্দ করার অছিলায় প্রায় তারা কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি করে ফেলে।
১৯৬৯ সালে বেরিয়েছিল আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘তিন ভুবনের পারে’। বেকার ও চাঁদা কাটা ছেলেদের উত্তরণের গল্প শুনিয়েছিলেন সেই সিনেমায় তিনি। তবে সব চাঁদা কাটার গল্প এমন সোহাগ-মাখা নয়। চাঁদার জুলুম একদা পুজোর আগে বিভীষিকা তৈরি করত। পাড়ায় থাকতে হলে যে টাকা চাওয়া হচ্ছে তা দিতে হবে, এই ছিল গণদাবি। চাঁদার টাকা কম দেওয়া হলে- দেওয়া হত পরিমিত বা অপরিমিত শাস্তি। হালে হয়তো চাঁদার জুলুম তুলনায় কমেছে অন্তত শহরে। তবে গ্রামে বা মফস্সলে চাঁদার দাবি ও চরিত্র বদলে গিয়েছে এমন নয়। এখনও রাস্তায় পথচলতি গাড়ি থামিয়ে চাঁদা চাওয়া হয়। কম দিলে বা না দিলে, গাড়ি যেতে না দেওয়ার অপসংস্কৃতি বহাল। ভোটের সময় রাজনৈতিক দলগুলি যে ‘ফান্ড’ প্রার্থনা করে, তাও তো প্রকারন্তরে চাঁদা।
তবে, বারোয়ারি পুজোর খরচ বহন করার অভিপ্রায়ে কাটা চাঁদা ও ভোট বৈতরণি পেরনোর জন্য প্রাপ্ত অর্থের প্রকৃতি ভিন্ন। একটি ক্ষেত্রে অবশ্য উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। চাঁদা বা জনতার থেকে সংগৃহীত অর্থের বেলায় জোরজবরদস্তি চলে না। যার যেমন সাধ্য দেবে, তা-ই গ্রহণ করা নিয়ম। সাধ্যের বাইরে কাউকে ঠেলে দেওয়া অনুচিত। কিন্তু এই ভাবাদর্শ কে মানে? সম্প্রতি অশোকনগরে, চাঁদা অনাদায়ে গৃহস্থের প্রতি হামলা করার অভিযোগ সামনে এসেছে। কেউ চাঁদা আদায়কে দেখে অধিকার প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে। কেউ চাঁদা দেওয়াকে দেখে প্রতিপত্তি ও স্বার্থরক্ষার দিক থেকে। চাঁদা তোলার অভিপ্রায় নিয়ে ক’জন ভাবে!
