মধ্য কলকাতায় ঠাকুর দেখা মানেই তালিকায় সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার...আলোর রোশনাই আর কাতারে কাতারে মানুষের ভিড়। বদ্রীনাথ মন্দির, অযোধ্যার রাম মন্দির, অপারেশন সিঁদুর— একের পর এক থিমে বছরে বছরে চমক দিয়েছে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি। পুজোর সূচনা হয় ১৯৩৬ সালে। এ বছর তার ৯১তম বর্ষ। এই বিখ্যাত সর্বজনীন দুর্গোৎসবে যাঁর নাম জড়িয়ে, সেই সন্তোষ মিত্র আদতে কে?
সন্তোষ মিত্র ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিযুগের বিপ্লবী। ১৯০০ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় জন্ম সন্তোষকুমার মিত্রের। আজকের সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের অদূরে ৯সি হলধর বর্ধন লেনের বাড়িতে জন্ম হয়েছিল তাঁর। আজ সেখানে রয়েছে স্মৃতি ফলক। লেবুতলা অঞ্চলে উদ্যানের নামকরণ করা হয় তাঁর নামেই। ১৯৫৬ সাল নাগাদ ‘সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার’-এর ভিতরে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করে পুরসভা।
১৯১৫ সালে হিন্দু স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন সন্তোষ মিত্র। ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (প্রেসিডেন্সি কলেজ) থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতক। সন্তোষ ছিলেন মেধাবী ছাত্র। এর পরে ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন। আইন পাশও করেছিলেন। দেশে তখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে। তরুণ সন্তোষকুমার মিত্রের চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন।
সন্তোষ জড়িয়ে পড়লেন স্বাধীনতা আন্দোলনে। বিপ্লবী ভূপতি মজুমদার, বারীণ ঘোষ, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তদের সঙ্গে পরিচয় হল। ১৯২২ সালে গড়ে তোলেন স্বরাজ সেবক সঙ্ঘ। তার পরে ১৯২৩ সালে ‘শাঁখারীটোলা হত্যা মামলায়’ এক ইংরেজ পোস্ট মাস্টারকে খুনের অভিযোগে সন্দেহের বশে গ্রেফতার। উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যান সন্তোষ। শ্রমিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ, চট্টগ্রামে যুব বিদ্রোহে গোপনে অস্ত্র সাহায্য করা, অহিংস আন্দোলনের সময়ে কারাবাস ইত্যাদি কারণে ব্রিটিশেরা তাঁর উপরে নজর রাখছিল।
এর পরে ইংরেজ সরকার ‘বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল’ আমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’ প্রয়োগ করে দেশের নিরাপত্তার জন্যে তাঁকে বিপজ্জনক ঘোষণা করে। সেই আইন অনুযায়ী, বিনা বিচারে যে কোনও মানুষকে আটকে রাখা যেত। সন্তোষ মিত্র হয়ে যান, ‘সিকিউরিটি প্রিজ়নার’। ‘সিকিউরিটি প্রিজ়নার’দের রাখার জন্য ১৯৩১ সালে ইংরেজ সরকার বহরমপুর, বক্সাদুয়ার এবং খড়গপুর রেল জংশনের কাছে হিজলীতে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করে। হিজলী ক্যাম্পে সন্তোষকে রাখা হয়েছিল।
সেই বছর ১৫ সেপ্টেম্বর হিজলী জেল থেকে তিন বিপ্লবী বন্দি পালিয়ে যান। ১৬ সেপ্টেম্বর বিশাল পুলিশ বাহিনী হিজলী ক্যাম্প ঘিরে ফেলে। চলে তল্লাশি। তাতেই থেমে থাকেনি ইংরেজরা। নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটায় তারা। পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। মোট ২৯ রাউন্ড গুলি চলে। ২৫ জন বন্দি গুরুতর আহত হন। পুলিশের গুলিতে মারা যান বিপ্লবী সন্তোষকুমার মিত্র ও তারকেশ্বর সেনগুপ্ত। ঘটনার প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। কলকাতায় প্রতিবাদ সভা আয়োজিত হয়েছিল। সন্তোষ মিত্রের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘‘ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে/ দয়াহীন সংসারে,/ তারা বলে গেল ক্ষমা করো সবে, বলে গেল ভালোবাসো/ অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো।’’ আজও ভারত মাতার বীর সন্তান শহিদ সন্তোষ মিত্রের স্মৃতি বহন করছে মধ্য কলকাতার অন্যতম বিখ্যাত বারোয়ারি পুজো।
এই প্রতিবেদনটি আনন্দ উৎসব ফিচারের অংশ।
