দিনাজপুরের বীরগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী মিলনমেলায় হাজারো মানুষের সমাগম ঘটেছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এ মেলায় দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নেন। তাঁদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মেলাটি পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
স্থানীয় নিজপাড়া ও মোহনপুর ইউনিয়নের উদ্যোগে এবং গোলাপগঞ্জ দুর্গাপূজা উদ্যাপন কমিটির তত্ত্বাবধানে এ মেলার আয়োজন করা হয়। প্রতিবছর দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার পর এ মেলা বসে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ আয়োজন আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
মেলাকে ঘিরে এলাকায় নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে। প্রচলিত একটি ধারণা হলো, এ মেলায় তরুণ-তরুণীরা জীবনসঙ্গী খুঁজতে আসেন। তবে এ ধারণার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আয়োজকেরাও জানিয়েছেন, বিয়ে বা জীবনসঙ্গী খোঁজার সঙ্গে মেলার কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁদের মতে, এটি মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের মিলন, পারস্পরিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখার একটি আয়োজন।
বীরগঞ্জ আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আহ্বায়ক জোসেফ হেমরম জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এ মেলার প্রচলন রয়েছে। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর দুর্গাপূজার পর মেলার আয়োজন করা হয়। সময়ের পরিবর্তন ঘটলেও এ আয়োজনের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি। বরং প্রতিবছর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মেলাটি আরও বিস্তৃত পরিসরে পরিচিতি পাচ্ছে।
মেলায় আসা বোচাগঞ্জের শেফালী হেমরম, নীলফামারীর মিলন টুডু ও হরিপুরের রবিন মার্ডি জানান, এ মেলা তাঁদের কাছে শুধু কেনাকাটা বা বিনোদনের জায়গা নয়। এটি আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন ও বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করার একটি বিশেষ উপলক্ষ। মেলার মাধ্যমে পুরোনো সম্পর্কগুলো আরও দৃঢ় হয় এবং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান নতুন প্রজন্মের সদস্যরা।
মেলায় বসে নানা ধরনের পণ্যের দোকান। কাচের চুড়ি, ফিতা, লিপস্টিক, কানের দুল, শাঁখা, মাটির তৈজসপত্র, খেলনা, দা-কুড়াল, হাঁড়ি-পাতিলসহ গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে দোকানিরা পসরা সাজান। এসব পণ্যের প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ ছিল লক্ষণীয়। বিশেষ করে নারীদের প্রসাধনসামগ্রী ও সাজসজ্জার উপকরণের দোকানগুলোতে ভিড় দেখা যায়। শিশুদের জন্যও ছিল বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকান।
পণ্যসামগ্রীর পাশাপাশি মেলায় ছিল খাবারের আয়োজন। জিলাপি, মিষ্টি ও বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকানে দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। পরিবার-পরিজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে নিয়ে অনেকে মেলায় ঘুরে বেড়ান, পছন্দের জিনিস কেনেন এবং খাবার উপভোগ করেন। দোকানপাট ও মানুষের উপস্থিতিতে পুরো মাঠজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
