‘‘কলকাতা বড় সুন্দর। এখানকার মানুষের মন খুবই বড়। অচেনা ব্যক্তি আমায় হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। আর কোথাও এমন দেখিনি। তাই সেই শহরকে আঁকার সাধ তো হবেই।’’ মধ্যপ্রদেশের ভোপাল থেকে এসে কলকাতার প্রেমে পড়ে গিয়েছেন শিল্পী রামকৃষ্ণ ধুরওয়ে। গোন্ড শিল্পের মাধ্যমে শহরকে রাঙিয়ে তুলছেন তিনি।
কেবল রামকৃষ্ণ নন, রাজ্যের অন্যত্র এবং ভিন্রাজ্য থেকে একাধিক শিল্পী কলকাতা শহরের মণ্ডপে মণ্ডপে পাঁচ ঘরানার চিত্রকলা ফুটিয়ে তুলেছেন। নানা ভাবে আঁকা হল কলকাতা শহরকে। আঁকলেন কলকাতার বাইরের শিল্পীরা। শহরের বাইরে থেকে কেমন লাগে কলকাতাকে, কেমন এই উদ্যাপন? দেশের পাঁচ জায়গার শিল্পীরা শহরের পাঁচ জায়গায় ‘আর্টচালা’-র কাজে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের একজোট করেছেন শিল্পী গোপাল পোদ্দার। কোথাও পিংলার স্ক্রল পটচিত্র শহরের মন্তাজ তুলে ধরেছে, কোথাও গোন্ড চিত্রশিল্প অথবা মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি চিত্রশিল্পের ঝলক, কোথাও বা মধুবনী চিত্রকলায় দেখা যাচ্ছে শ্রমিকদের ঘাম ঝরানোর গল্প, আবার কোথাও ওড়িশার রঘুরাজপুরের পটশিল্পের মাধ্যমে শহর ধরা দিচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে।
পটচিত্র, গোন্ড শিল্প, মধুবনী চিত্রকলার মতো একাধিক ঘরানায় ছবি আঁকা চলছে শহর জুড়ে। ২০১৭ সালে মেদিনীপুরের চণ্ডীতলার নুরদিন চিত্রকর রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার আগের বছর নুরদিনের স্ত্রী কল্পনা চিত্রকরও একই পুরস্কারে সম্মানিত হন। পুত্র বাপ্পাও ইতিমধ্যে রাজ্যের একাধিক প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রমাণ করে ফেলেছেন। নুরদিন সপরিবার চলে এসেছেন শহরে। শিল্পী বলছেন, ‘‘আমাদের এখানে খোলা আকাশের নীচেই আড্ডা হয়, গানবাজনা হয়। কিন্তু কলকাতা শহর মানেই তো গাড়িঘোড়ার আওয়াজ। সেখানে রাস্তায় গানগল্প করার চেয়ে চার দেওয়ালের মধ্যেই আড্ডাটা বেশি জমে।’’ তাই ২০/১০ ফুটের ক্যানভাস জুড়ে বাঙালিদের ঘরোয়া আড্ডার ছবি আঁকছেন নুরদিন ও তাঁর পরিবার। পটচিত্রই তাঁদের পেশা ও নেশা। কিন্তু সেই শিল্পে এ বার নতুনত্বের ছোঁয়া। যা তাঁরা সচরাচর করেন না। সাদা ক্যানভাসে একে একে আঁকা হয়েছে গিটার, হারমোনিয়াম এবং তবলাবাদকদের ছবি। গানবাজনা, আড্ডার পাশাপাশি চলছে 'ঘর সাজানো'। পটের পরিসরে কেউ খবরের কাগজ পড়ছে, কেউ চায়ে চুমুক দিচ্ছে। ঘরভর্তি বইপত্র ছড়ানো। ক্যানভাস জুড়ে কিছু পুরনো, কিছু নতুন।
শহরের অন্য প্রান্তে গোন্ড শিল্পীদের রঙিন তুলি আঁকছে শহরের আর একটি দিকের গল্প। কলকাতাকে উৎসবের জন্য প্রস্তুত করার নেপথ্যে যে শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রম অধিকাংশের চোখ এড়িয়ে যায়, তাঁদের ছবি এঁকেছেন রামকৃষ্ণেরা। শহরের সংস্কৃতির ছবিও উঠে এসেছে তাঁদের তুলির টানে। এর সঙ্গে গাছ বাঁচানোর বার্তাও মিলেমিশে গিয়েছে গোন্ড শিল্পে। রামকৃষ্ণ মনে করালেন, তাঁদের গোন্ড শিল্পেও সবুজকে রক্ষা করার প্রয়াস থাকে। তাঁদের শিল্পে গাছের জায়গা অনেকখানি জুড়ে। ফলে সব মিলেমিশে একাকার।
বহু বছর ধরে মধুবনী শিল্পের চিত্রাঙ্কনের কাজে বিহার থেকে কলকাতায় যাতায়াত করতে হয় প্রভাকর ঝাকে। কিন্তু এ বারের কাজ একটু আলাদা। এই শহরকে দেখা, এই শহরকে চেনা তাঁদের শিল্পে প্রতীয়মান। জেলা পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী তাই বলছেন, ‘‘এত বছর ধরে কলকাতার সঙ্গে পরিচিতি, সেটাই আঁকার মধ্যে রেখেছি। এখানকার সংস্কৃতি, অভ্যাস, মানুষের আচরণ, সব কিছুই অন্য রকমের সুন্দর। আর এই সমস্তই ছবিতে রয়েছে।’’ শ্যামবাজার আর এসপ্ল্যানেডের ট্রাম, হলুদ ট্যাক্সি, টানা রিক্সা থেকে শুরু করে প্রভাকরের ক্যানভাসে জায়গা পেয়েছে হাতিবাগানের মার্কেট, হাওড়া ব্রিজের নীচে ফুলের বাজার, গঙ্গার ঘাট এবং ব্রিজগুলিও।
জমজমাট এক শহরের ছবি। কিন্তু নানা দিক থেকে দেখা। নানা দিক থেকে আঁকা। ‘আর্টচালা’ শহরকে শুধু উৎসবের জন্য নয়, শিল্পের জন্যও প্রস্তুত করে তুলেছে। কিছু অচেনা, কিছু হারিয়ে যাওয়া, কিছু এড়িয়ে যাওয়া লোকশিল্পগুলি এ বার মানুষের চোখের সামনে।
