ক্রিকেট বড় অদ্ভুত খেলা। এখানে কেউ ১০০ রান করেও দলকে জেতাতে পারেন না, আবার কেউ একটি রানও না করে হয়ে যেতে পারেন নায়ক। কখনো কখনো শূন্য রানের ইনিংসও যে সেঞ্চুরির মতো মূল্যবান হয়ে ওঠে!
ভাবুন তো, একজন ব্যাটসম্যান ক্রিজে দাঁড়িয়ে আছেন। একের পর এক বল আসছে। তিনি ঠেকিয়ে যাচ্ছেন। রান নেওয়ার কোনো তাড়া নেই। বাউন্ডারি মারার ইচ্ছাও নেই। ব্যাট যেন তলোয়ার নয়, ঢাল। প্রতিপক্ষের বোলাররা তাঁকে আউট করতে মরিয়া। ফিল্ডাররা অধৈর্য। দর্শকেরাও হয়তো ভাবছেন, লোকটা একটা রান অন্তত নেবেন কবে! কিন্তু ব্যাটসম্যানের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁর কাছে তখন রান করার চেয়ে উইকেটে টিকে থাকাটাই বড় কথা।
শেষ পর্যন্ত আউট হলেন। স্কোরবোর্ডে নামের পাশে সেই গোল্লা। শূন্য!
ক্রিকেটের ভাষায় যাকে বলে ‘ডাক’। সাধারণত ব্যাটসম্যানদের কাছে যা লজ্জার, কখনো কখনো সেই শূন্যই হয়ে ওঠে গৌরবের। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন কিছু শূন্য রানের ইনিংস আছে, যেগুলো মনে করিয়ে দেয়, ক্রিকেট শুধু রান করার খেলা নয়। কখনো কখনো রান না করেও অনেক কিছু করে ফেলা যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে কিংসমিডের এক টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার নিক ম্যাডিনসনের ইনিংসটাই ধরুন। দলে ফিরে ব্যাট করতে নেমেছিলেন। ৩৩টি বল খেললেন। একটি রানও করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত আউট হয়ে ফিরলেন ৩৩ বলে শূন্য রানে।
৩৩ বলের এই শূন্য তাঁকে জায়গা করে দিয়েছে টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি বল খেলে শূন্য রানে আউট হওয়া ব্যাটসম্যানদের তালিকায় ১৬ নম্বরে।
কিন্তু ম্যাডিনসন একা নন। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর চেয়েও দীর্ঘ, আরও বিস্ময়কর কিছু শূন্য রানের ইনিংস আছে। কোনোটিতে বীরত্ব, কোনোটিতে ট্র্যাজেডি। আবার কোনোটিতে ব্যাটসম্যানের এমন অনমনীয় প্রতিরোধ, যেন রান না করাটাই জীবনের একমাত্র ব্রত!
চলুন, সেই পাঁচটি শূন্য রানের গল্প শোনা যাক।
জিওফ অ্যালট: ৭৭ বলের এক মহাকাব্য

১৯৯৯ সাল। নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার দুর্ধর্ষ বোলিং আক্রমণের সামনে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা কঠিন পরীক্ষায়। এমন সময় ক্রিজে এলেন জিওফ অ্যালট। মূলত পেস বোলার। ব্যাটিং তাঁর প্রধান কাজ নয়। কিন্তু সেদিন যেন অন্য এক দায়িত্ব নিয়ে নেমেছিলেন। উইকেটটা বাঁচাতে হবে।
ব্যস, শুরু হলো অ্যালটের প্রতিরোধ। বল আসছে, তিনি ঠেকাচ্ছেন। আবার বল আসছে, আবার ঠেকাচ্ছেন। এভাবে কেটে গেল ১০১ মিনিট। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা! এই সময়ে খেললেন ৭৭টি বল। রান কত? শূন্য।
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, ৭৭ বল খেলে একটি রানও করতে পারেননি অ্যালট। শেষ পর্যন্ত জ্যাক ক্যালিস তাঁকে আউট করেন। কিন্তু ততক্ষণে নিজের কাজটা করে ফেলেছেন নিউজিল্যান্ডের এই পেসার। তাঁর প্রতিরোধে গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ জুটি নিউজিল্যান্ডকে ম্যাচ ড্র করতে সাহায্য করেছিল। অ্যালটের নামের পাশে তাই শূন্য লেখা থাকলেও ইনিংসটির মূল্য মোটেও শূন্য নয়।
টেস্ট ক্রিকেট তো বটেই, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসেও সবচেয়ে বেশি বল খেলে শূন্য রানে আউট হওয়ার রেকর্ডটি তাঁর।
জেমস অ্যান্ডারসন: জয়ের স্বপ্ন ভাঙল শেষ দুই বলে

কোনো কোনো পরাজয় থাকে, যা জয়ের চেয়েও বেশি মনে থাকে। ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসনের ৫৫ বলের শূন্য তেমনই এক ট্র্যাজিক গল্প।
২০১৪ সাল। হেডিংলিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট। শেষ বিকেলে ইংল্যান্ডের সামনে কঠিন সমীকরণ। ম্যাচ বাঁচাতে হলে টিকে থাকতে হবে। রান নয়, প্রয়োজন শুধু সময় পার করা। ক্রিজে অ্যান্ডারসন। বল হাতে যিনি ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি, ব্যাট হাতে সেদিন তাঁর দায়িত্ব অন্য রকম।
একটার পর একটা বল ঠেকিয়ে যাচ্ছেন। শ্রীলঙ্কার বোলাররা আক্রমণ করছেন। ফিল্ডাররা ঘিরে ধরছেন। কিন্তু অ্যান্ডারসন যেন পণ করেছেন, কিছুতেই আউট হবেন না।
এভাবে কেটে গেল ৮১ মিনিট। খেললেন ৫৫টি বল। রান একটিও নেই।
কিন্তু তাতে কি! ইংল্যান্ডের তখন রান চাই না। চাই শুধু শেষ কয়েকটি বল পার করে দেওয়া।
ম্যাচ শেষ হতে বাকি মাত্র দুই বল। এই সময়ই ঘটল ট্র্যাজেডি। শর্ট বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন অ্যান্ডারসন। তাঁর ৫৫ বলের প্রতিরোধ শেষ। সঙ্গে ইংল্যান্ডের ম্যাচ বাঁচানোর স্বপ্নও। শ্রীলঙ্কা পেল নাটকীয় জয়।
রিচার্ড এলিসন: মুম্বাইয়ে ৫২ বলের লড়াই

আশির দশকের ক্রিকেট। ভারতীয় উপমহাদেশের স্পিন সহায়ক উইকেট। বিদেশি ব্যাটসম্যানদের জন্য অনেক সময়ই যা দুঃস্বপ্ন। ১৯৮৪ সালে মুম্বাইয়ে ভারতের বিপক্ষে তেমনই এক পরীক্ষায় পড়েছিলেন ইংল্যান্ডের রিচার্ড এলিসন। সুইং বোলার হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। কিন্তু সেদিন ব্যাট হাতে তাঁকে লড়তে হচ্ছিল ভারতের নিয়ন্ত্রিত বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে। এলিসন বুঝেছিলেন, আক্রমণ করে লাভ নেই। বাঁচতে হলে রক্ষণই ভরসা।
শুরু হলো তাঁর ডিফেন্সের প্রদর্শনী। একের পর এক বল খেলছেন। কিন্তু রান নেই। ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে পাচ্ছেন না। স্ট্রাইক বদলানোরও সুযোগ হচ্ছে না। ৫২টি বল খেললেন। তবু স্কোরবোর্ডে তাঁর নামের পাশে সেই শূন্য। শেষ পর্যন্ত আউট হলেন। ইংল্যান্ডও ৮ উইকেটে হেরে গেল ম্যাচটা।
পিটার সাচ: ওল্ড ট্রাফোর্ডে ৫১ বলের জেদ

ব্যাটসম্যান হিসেবে পিটার সাচের তেমন কোনো খ্যাতি ছিল না। ইংল্যান্ডের এই অফ স্পিনারের আসল কাজ ছিল বল হাতে উইকেট নেওয়া। কিন্তু ১৯৯৯ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এমন এক ইনিংস খেললেন, যা তাঁকে ব্যাটিংয়ের এক অদ্ভুত রেকর্ডের অংশ করে রাখল।
কঠিন পরিস্থিতিতে ক্রিজে এসে সাচ যেন ঠিক করলেন, ব্যাট চালিয়ে কোনো ঝুঁকি নেবেন না। বল ঠেকাবেন। শুধু ঠেকাবেন। ১ বল, ২ বল, ১০ বল, ২০ বল। এভাবে ৫১টি বল খেলে ফেললেন। রান? একটিও নয়। অবশেষে আউট হয়ে ফিরলেন শূন্য রানে। ততক্ষণে ম্যাচে ইংল্যান্ডের হার এড়ানো নিশ্চিত হয়ে গেছে।
ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য বলতে আমরা সাধারণত কাভার ড্রাইভ, পুল কিংবা কাট শট বুঝি। কিন্তু সাচ সেদিন দেখিয়েছিলেন, ব্যাটের মাঝখান দিয়ে বলটা মাটিতে নামিয়ে দেওয়ার মধ্যেও একধরনের সৌন্দর্য আছে। সেটা প্রতিরোধের সৌন্দর্য, জেদের সৌন্দর্য। হারতে বসা ম্যাচ ড্র করে ফেলার সৌন্দর্য।
মিগুয়েল কামিন্স: ৪৫ বলের নীরব প্রতিরোধ

সময়টা ২০১৯ সাল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অ্যান্টিগার নর্থ সাউন্ডে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট। ভারতীয় বোলিং আক্রমণের সামনে চাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাট হাতে নামলেন পেসার মিগুয়েল কামিন্স। তাঁর কাছে কেউ সেঞ্চুরি আশা করছিলেন না। এমনকি বড় কোনো ইনিংসও নয়। দরকার ছিল শুধু যতক্ষণ সম্ভব ক্রিজে থাকা।
কামিন্স সেটাই করলেন। ভারতের বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের সামনে একের পর এক বল ঠেকিয়ে গেলেন। নিজের উইকেট বাঁচানোর পাশাপাশি সঙ্গী ব্যাটসম্যানকে সাহায্য করলেন। ৪৫টি বল খেললেন। কিন্তু একটি রানও এল না।
ওটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস ছিল। পরে সেই ম্যাচ অবশ্য জিতে নেয় ভারত। তবে কামিন্সের লড়াইটা ছিল দেখার মতো।
