ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথির সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। দেশটির রাজধানী সানায় হুথি বিদ্রোহীদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে মঙ্গলবার রাতে ব্যাপক হামলা চালায় সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী।
অপরদিকে সৌদির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি আরামকোর দাহরান কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছে হুথিরা। এতে ভবনটিতে আগুন ধরে যায়। এ পরিস্থিতির মধ্যে বুধবারও সৌদির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা, যা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ঠেকিয়েছে।
এ সময় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক আরব নাগরিক আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একটি বাড়ি ও একটি গাড়ি।
বুধবার সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানায়। এতে বলা হয়, রিয়াদে হামলার আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি তেল স্থাপনায় হামলা চালায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
এর জবাবে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়েছিল হুথিরা।
মঙ্গলবারের এসব পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই পক্ষের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। হুথির হামলায় আরামকোর সদর দপ্তর কমপ্লেক্সে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভবনটির একটি অফিস টাওয়ারের ওপরের তিনটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাহরানে অবস্থিত আরামকোর থেকে দেশটির বিস্তৃত তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন, শোধনাগার ও রপ্তানি টার্মিনালের কার্যক্রম তদারকি করা হয়।
এর আগে হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদির তেল স্থাপনার আশপাশে থাকা কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। এসব স্থাপনাকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একইভাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের রাজধানী সানার উপকণ্ঠে ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় জ্বালানি ডিপো থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
জোটের এই নির্দেশের জবাবে ইয়াহিয়া সারি হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, সানায় হামলা চালানো হলে সৌদির রাজধানী রিয়াদে ‘কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক’ পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
হামলার আশঙ্কায় সানার কয়েকটি পেট্রোল পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে জ্বালানির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে ইয়েমেনের তেল কোম্পানি জানায়, তাদের মজুতকেন্দ্রগুলো খালি ছিল। ফলে সৌদি হামলায় তেলের মজুত বা বাসিন্দাদের সরবরাহে প্রভাব পড়বে না।
ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে বলেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানায় হামলা চালালে যেসব স্থাপনা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোয় আঘাত হানবে হুথি।
সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, প্রতিহত করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫টি বাড়ি। আহতদের মধ্যে দুজন নারী, এক পুরুষ ও এক শিশু রয়েছে।
সৌদি আরবের বিশেষ স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে এক সপ্তাহ ধরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে হুথি। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। এর জেরেই হুথি সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হন। আহত হন ৩০০ জনের বেশি। এক দশকে সৌদি আরবে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। হামলার পর দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়।
রোববারের হামলায় আরও একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হন। এ ছাড়া সরকারপন্থি ইয়েমেনি বাহিনী মঙ্গলবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের অবস্থান ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে একাধিক বিমান হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে।
তাইজ প্রদেশে ৯টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ধুবাব জেলায় এবং চারটি আল-মাসরাখ জেলায়।
ইয়েমেনের সরকার এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাইজ মিলিটারি অ্যাক্সিস মিডিয়া সেন্টার জানিয়েছে, তাইজ শহরের দক্ষিণে আল-শাকাব এলাকায় সরকারপন্থি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই চলছে।
এদিকে ইয়েমেন নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডম মঙ্গলবার জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় তাইজে হুথিদের হামলায় অন্তত ৫ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সি এক মেয়েশিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন।
সংগঠনটির অভিযোগ, হুথিরা আবাসিক এলাকায় গোলাবর্ষণ করেছে। এতে অন্তত সাতটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগের ২৪ ঘণ্টায় তাইজজুড়ে ১৮০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে।