ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধে পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে এসআরবি। তাঁদের মধ্যে মাত্র দুজন দেশে ফিরতে পেরেছেন। এখনো ছয়জন যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন এবং দুজন মস্কোর একটি হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
এসআরবি জানায়, এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে (৫০) গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। চক্রের বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর তাদের জোর করে দেশটির সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে মানব পাচার চক্রটির বিরুদ্ধে।
২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। সেখানে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান।
এসআরবি জানায়, এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে (৫০) গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। চক্রের বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া এসব মানুষকে যুদ্ধের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি ছাড়াই রণক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল।
প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাদের একধরনের 'শিকার' হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।তাদের ওপর ড্রোন হামলা হলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতো।
এসআরবি জানায়, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের প্রতিশ্রুত চাকরি দেওয়া হয়নি।
বরং পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে এসআরবি। এরপর মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিভিন্ন অংশে মোতায়েন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, যাদের বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হয়েছে, আসলে তারা কেউ যুদ্ধ করার মতো যোগ্য নয়। যুদ্ধের জন্য তাদের শারীরিক, প্রশিক্ষণ বা কৌশল, কোনো ধরনেরই অনুশীলন ছিল না।
তিনি বলেন, 'আমরা যেটা বুঝতে পেরেছি, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য, একধরনের শিকার হিসেবে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। যখন প্রতিপক্ষ তাদের ওপর ড্রোন হামলা করে, তখন ওই দেশটি শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে।'
এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রের তিনটি অংশ- প্রথম সারি, মধ্যভাগ ও শেষভাগে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। সেখানে প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয় বলে তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।
সবমিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে এসআরবি। তবে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার ও পরিচয়ের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়নি।
এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। জীবিতদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। অন্য দুজন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি ছয়জন এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে অন্তত দুজন আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি। তাদের একজন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন (২১)।
এসআরবির দেওয়া মামলার বিবরণ অনুযায়ী, নির্মাণকাজের কথা বলে রাজনকে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। গত ৭ মে সেখানে পৌঁছানোর পর অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে তাকেও রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাকে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে ড্রোন হামলায় রাজনের কোমরের হাড় ভেঙে যায়। শরীরের নিচের অংশের শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পে পৌঁছানোর কথা জানান তিনি।
এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আহত অবস্থায় রাজন চার দিন কষ্ট করে হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসা নেন। একপর্যায়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট ২০২৬ দেশে ফেরেন তিনি।
রাজনের পরিবারের অভিযোগ, তাকে দেশে ফেরানোর পর ক্ষতিপূরণ দাবি করলে মিজানুর রহমান তাদের গালিগালাজ করেন, মারধরের চেষ্টা করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। এ ঘটনায় রাজনের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করা হয়।
এসআরবি জানায়, রাজন হোসেনকে রাশিয়ায় পাঠানোর ঘটনায় করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার পাঠানো চাহিদাপত্রের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।
গত ১৩ অক্টোবর ফরিদপুরের নগরকান্দা থানার আটাইল এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-১০, সিপিসি-৩-এর ফরিদপুর ক্যাম্পের একটি দল। তিনি ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানার চর হরিরামপুর এলাকার ওমর আলী সরদারের ছেলে।
একইদিন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকা থেকে আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৬। তিনি কালীগঞ্জ থানার একতারপুর এলাকার মৃত আমজাদ আলী বিশ্বাসের ছেলে।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, মিজানুর রহমান জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ও লেন্টুসহ চক্রের অন্য সদস্যরা পারস্পরিক যোগসাজশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাঠানোর সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
মানব পাচার চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে এসআরবি।
এছাড়া চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাশিয়ায় এভাবে শুধু বাংলাদেশিরাই নন, বিভিন্ন দেশের মানুষ যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে- গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দা রয়েছেন বলে জানিয়েছেন মোহা. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। উন্নত জীবনের আশায় জমি-সম্পদ বিক্রি বা ধারদেনা করে যারা বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন, তাদের পরিবার এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে এবং যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এসআরবির এই কর্মকর্তা।
