গোল হলো। গ্যালারিতে তখন আনন্দের বিস্ফোরণ। হাজার হাজার মানুষ লাফিয়ে উঠেছেন। কেউ চিৎকার করছেন, কেউ জড়িয়ে ধরছেন পাশের মানুষটিকে; কিন্তু এর মধ্যেও কিছু দর্শকের চোখ আটকে আছে মুঠোফোনের পর্দায়। গোলটা উপভোগ করার চেয়ে সেটির ভিডিও ধারণ করতেই যেন তাঁদের বেশি আগ্রহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টও তো দিতে হবে!
ফুটবল মাঠের গ্যালারিতে এমন দৃশ্য এখন আর নতুন কী! প্রযুক্তির এই যুগে মাঠের ফুটবলের সঙ্গে যেন সমানতালে চলছে মুঠোফোনের ফুটবলও। কখনো কখনো তো মনে হয়, খেলা দেখতে নয়, খেলা দেখছেন, সেটা অন্যদের দেখাতেই মাঠে এসেছেন কেউ কেউ!
জার্মান ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ড এবার এই অভ্যাসে একটু বদল আনতে চায়। তবে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন—মুঠোফোন যত কম ঘাঁটবেন, পুরস্কার জেতার সম্ভাবনা তত বেশি!
পুরস্কারও নেহাত মন্দ নয়। প্রিয় খেলোয়াড়দের সই করা জার্সি, ক্লাবের পণ্য কেনার ভাউচার। অর্থাৎ ফোনের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে মাঠের দিকে তাকালেই মিলতে পারে উপহার।
অভিনব এই উদ্যোগের নাম ‘ফ্যান মোড’। ডর্টমুন্ডের নিজস্ব অ্যাপে চালু হয়েছে নতুন সুবিধাটি। শনিবার আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের বিপক্ষে বুন্দেসলিগার ঘরের মাঠের ম্যাচ দিয়েই শুরু হয়েছে কার্যক্রম (১–০ গোলে জিতেছে ডর্টমুন্ড)।
কিন্তু ফোন কম ব্যবহার করছেন কি না, সেটা বোঝা যাবে কীভাবে?
দর্শকদের প্রথমে ডর্টমুন্ডের অ্যাপে ‘ফ্যান মোড’ চালু করতে হয়। এরপর ম্যাচ চলাকালে কতবার ফোন আনলক করছেন, তার হিসাব রাখে অ্যাপটি। অবশ্য বিরতির সময় ফোন ব্যবহারের জন্য কোনো ‘জরিমানা’ নেই।
নিয়মটা সহজ। ফোন যত কম আনলক করবেন, পয়েন্ট তত বেশি থাকবে। বারবার ফোন আনলক করলে কমতে থাকবে পয়েন্ট। ম্যাচ শেষে যাঁদের পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি, পুরস্কার জেতার সুযোগ তাঁর বা তাঁদেরই।
তবে ডর্টমুন্ড কাউকে ফোন ব্যবহারে বাধা দিচ্ছে না। পুরো কার্যক্রমই স্বেচ্ছামূলক। ইচ্ছা হলে অংশ নিন, না হলে আগের মতোই ফোনে ছবি তুলুন, ভিডিও করুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিন।
প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ এমন উদ্যোগ কেন?
ডর্টমুন্ডের যুক্তি, গ্যালারিতে সেলফি তোলা, সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরিতে এতটাই ব্যস্ত থাকেন কিছু দর্শক, মাঠের ফুটবল উপভোগের আসল আনন্দটাই হারিয়ে যায়। শুধু তা নয়, তাঁদের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হন আশপাশের দর্শকেরাও।
অথচ ফুটবল মাঠের গ্যালারির আনন্দটাই অন্য রকম। বিশেষ করে ডর্টমুন্ডের সিগন্যাল ইদুনা পার্কের মতো স্টেডিয়ামে।

এই মাঠের দক্ষিণ গ্যালারির বিখ্যাত ‘ইয়েলো ওয়াল’ তো ফুটবল দুনিয়ারই এক বিস্ময়। হলুদ জার্সি পরা হাজার হাজার সমর্থকের সম্মিলিত গর্জন, গান আর উল্লাসে তৈরি হয় এক আশ্চর্য পরিবেশ। প্রতিপক্ষের কাছে যা রীতিমতো আতঙ্কের, ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সেটিই অপার মুগ্ধতার।
ডর্টমুন্ডের প্রধান নির্বাহী কার্স্টেন ক্রেমার সেই অভিজ্ঞতার কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘স্টেডিয়ামে ৮১ হাজারের বেশি মানুষ একসঙ্গে গান গাইছেন, উল্লাস করছেন, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছেন। এই মুহূর্ত, এই অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই।’
ডর্টমুন্ড আসলে চায়, দর্শকেরা যেন ফোনের পর্দায় সেই অভিজ্ঞতা ধারণ করার চেয়ে নিজেরাই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠেন।
তবে শুধু ডর্টমুন্ড নয়, জার্মান ফুটবলে গ্যালারিতে মুঠোফোন ও ক্যামেরার অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি বাড়ছে।
অনেকেই পেশাদার ক্যামেরা নিয়ে মাঠে আসেন। এরপর ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। এতে অন্য দর্শকদের খেলা দেখার অভিজ্ঞতা যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি প্রশ্ন ওঠে ক্লাবের সম্প্রচারস্বত্ব নিয়েও।
জার্মানির দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব হার্থা বার্লিন এ মাসেই জানিয়েছে, স্টেডিয়ামে পেশাদার সরঞ্জাম ব্যবহার করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ভ্লগ তৈরি এবং তা থেকে অর্থ উপার্জনের জন্য প্রকাশ করার অনুমতি আর দেওয়া হবে না। তবে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ছবি তোলা কিংবা ভিডিও ধারণে কোনো বাধা নেই।
এর আগে আগস্টে একই ধরনের পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছিল আরেক জার্মান ক্লাব দিনামো ড্রেসডেন। তাদেরও যুক্তি, দর্শকদের স্বচ্ছন্দে খেলা দেখার সুযোগ করে দেওয়া এবং ক্লাবের সম্প্রচারস্বত্ব রক্ষা করা।
ডর্টমুন্ড অবশ্য হার্থা কিংবা ড্রেসডেনের মতো নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটেনি। বরং দর্শকদের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছে পুরস্কারের হাতছানি।