প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৬(ক) ধারা বাতিলসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিকের বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষায় ১০ দফা সুপারিশ দিয়েছে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)।
সরকারি বিজ্ঞাপনের মূল্য পুনর্নির্ধারণের দাবি
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৬(ক) ধারা বাতিলসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিকের বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষায় ১০ দফা সুপারিশ দিয়েছে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)। সংগঠনটি বলেছে, প্রস্তাবিত আইনের অপব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে। বিবৃতিতে সংগঠনটি প্রত্যাশা করেছে, জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার এমন কোনো আইন প্রণয়ন করবে না, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ নিয়ে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের (এনইসি) ১০ দফা সুপারিশ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার ক্ষমতা সীমিত রাখা: নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বাইরে সরকারের অন্য কোনো সংস্থা বা বাহিনীকে এ আইনের অধীনে ক্ষমতা দেয়া যাবে না।
২. তথ্য-উপাত্ত অপসারণে বিচারিক অনুমোদন: কোনো তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার আগে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. মানহানির ধারা বাদ দেয়া: প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে মানহানিসংক্রান্ত কোনো ধারা অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কারণ, এ বিষয়ে দণ্ডবিধিতে আগে থেকেই বিধান রয়েছে।
৪. সাইবার বুলিংয়ের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা: সাইবার বুলিং-সংক্রান্ত অপরাধের ব্যাখ্যা সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট করতে হবে, যাতে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।
৫. ২৬(ক) ধারা বাতিল করা: সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রচারসংক্রান্ত প্রস্তাবিত ২৬(ক) ধারা প্রত্যাহার করতে হবে, যাতে এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়।
৬. ২৯ ধারার নিবন্ধন বাতিলের বিধান প্রত্যাহার: কোনো কোম্পানির নিবন্ধন স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করার বিধান বাদ দিতে হবে। এর পরিবর্তে অর্থদণ্ডের বিধান রাখা যেতে পারে।
৭. ৪১ ধারা থেকে ২৬ (ক) বাদ দেয়া: ৪১ ধারায় অন্তর্ভুক্ত ২৬(ক) ধারার বিধান বিলুপ্ত করতে হবে।
৮. সাংবাদিকতা ও বৈধ মতপ্রকাশের সুরক্ষা: সাইবার সুরক্ষা আইনের অপব্যবহার থেকে সাংবাদিকতা ও বৈধ মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় আইনে সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে।
৯. সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিচারিক অনুমোদন: পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এ আইনে ব্যবস্থা নেয়ার আগে বিচারিক অনুমোদন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
১০. মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিচারের বিধান বাতিল: সাইবার অপরাধের বিচার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে করার প্রস্তাবিত বিধান বিলুপ্ত করতে হবে। এনইসির মূল বক্তব্য হলো সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও জনগণের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি বিজ্ঞাপনের মূল্য পুনর্নির্ধারণের দাবি এনইসির : সম্প্রতি সরকারি বিজ্ঞাপনের মূল্যবৃদ্ধি করে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছে, তা অপ্রতুল ও অগ্রহণযোগ্য বলে পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)। সংগঠনের সভাপতি ও যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান এবং সাধারণ সম্পাদক ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান রোববার এক যুক্ত বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ের পত্রপত্রিকায় প্রদেয় সরকারি বিজ্ঞাপনের মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। চলমান বিজ্ঞাপনের মূল্যহার এখন থেকে সাত বছর আগে-অর্থাৎ ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে সে মূল্যহার ছিল ২০০৬ সালের প্রস্তাবিত, যা বাস্তবায়িত হয়েছিল প্রস্তাবনার ১৩ বছর পর ২০১৯ সালে। এরপর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও বিজ্ঞাপনের মূল্যহার আর সমন্বয় করা হয় নি। এ সময়ের মধ্যে প্রকাশনা শিল্পের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে এবং কয়েক দফায় সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেল ঘোষিত হয়েছে।
এরই মধ্যে নিউজপ্রিন্ট, কালি, অন্যান্য প্রকাশনা সামগ্রীর দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পেলেও প্রয়োজনের আলোকে বিজ্ঞাপনের মূল্যহার বৃদ্ধি পায় নি। এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টার সাথে সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। যেখানে সংবাদপত্র শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনের সর্বনিম্ন হার ৯০০ এবং সর্বোচ্চ মূল্যহার ৩,০০০ টাকা প্রতি কলাম ইঞ্চি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ১৩ অক্টোবর বিজ্ঞাপনের মূল্যহার নির্ধারণ করে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছে, তা প্রস্তাবের তুলনায় অনেক কম।
ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি) মনে করে, বিজ্ঞাপনের মূল্যহার পত্রিকার সংখ্যাভেদে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা মোটেই বাস্তবসম্মত নয় এবং এতে সংবাদপত্র শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এমতাবস্থায় বর্তমান ব্যয় বিবেচনা করে সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, যাতে সরকারি বিজ্ঞাপনের মূল্যহার ২২ শতাংশের জায়গায় ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। আমরা আরো প্রস্তাব করছি, রঙিন বিজ্ঞাপন এবং প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠায় বিজ্ঞাপন ছাপার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রযোজ্য অতিরিক্ত মূল্যহার বৃদ্ধি করতে না পারলেও যেন অপরিবর্তিত রাখা হয়।
