দুধ খেলেই পেট ফাঁপা, গ্যাস বা ডায়েরিয়া? অনেকেই এমন সমস্যাকে সাধারণ হজমের গোলমাল ভেবে এড়িয়ে যান। কেউ আবার দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেন। অথচ এই সমস্যার পিছনে থাকতে পারে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স।
সম্প্রতি অভিনেতা সইফ আলি খান জানিয়েছেন, অ্যালার্জি সংক্রান্ত একাধিক পরীক্ষা করানোর পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর রয়েছে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স। ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কপিল শো’-তে কপিল শর্মার সঙ্গে কথোপকথনে নিজের এই সমস্যার কথা জানান অভিনেতা।
কিন্তু ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স কি সব সময় বংশগত? নাকি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বা অন্য কোনও অসুখের কারণে দেখা দিতে পারে এই সমস্যা?
দুধ হজমে বাধা কোথায়?
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারে থাকে ল্যাকটোজ নামে এক ধরনের প্রাকৃতিক শর্করা। এই শর্করা ভাঙতে সাহায্য করে ল্যাকটেজ নামের একটি উৎসেচক, যা ক্ষুদ্রান্ত্রে তৈরি হয়। শরীরে পর্যাপ্ত ল্যাকটেজ না থাকলে ল্যাকটোজ ঠিকমতো হজম হয় না। অপাচ্য ল্যাকটোজ বৃহদন্ত্রে পৌঁছলে সেখানকার ব্যাকটেরিয়া তা ভাঙতে শুরু করে। এর ফলে গ্যাস তৈরি হয় এবং অন্ত্রে বেড়ে যায় তরলের পরিমাণ। সেই কারণেই দুধ খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, পেটে মোচড়, অতিরিক্ত গ্যাস বা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকেই বলা হয় ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স।
সবটাই কি জিনের দোষ?
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের সবচেয়ে সাধারণ ধরনটি জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সব ক্ষেত্রে যে বংশগত কারণই দায়ী, তা নয়। চিকিৎসকদের কথায়, দুধ খাওয়ার পর পেটের সমস্যা হলেই ধরে নেওয়া যায় না যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছোটবেলা থেকেই এই সমস্যায় ভুগছেন। বয়স বাড়ার পর নতুন করে উপসর্গ দেখা দিলে অন্ত্রের কোনও অসুখ এর নেপথ্যে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের রকমফের
প্রাইমারি ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স: এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরন। জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে ল্যাকটেজ তৈরির পরিমাণ কমতে পারে। ফলে দুধ হজম করতে অসুবিধা হয়।
সেকেন্ডারি ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স: এটি জন্মগত নয়। সিলিয়াক ডিজিজ, ক্রোনস ডিজিজ বা গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসের মতো অসুখে ক্ষুদ্রান্ত্রের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ল্যাকটেজ তৈরির ক্ষমতা কমে যেতে পারে। অন্ত্র সুস্থ হয়ে উঠলে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাও কমে যায়। অন্ত্রে অস্ত্রোপচার বা আঘাতের কারণেও এমন হতে পারে।
কনজেনিটাল ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স: এটি অত্যন্ত বিরল জিনগত সমস্যা। এই ক্ষেত্রে শিশু জন্ম থেকেই ল্যাকটেজ তৈরি করতে পারে না বা তার কার্যকারিতা অত্যন্ত কম থাকে।
ডেভেলপমেন্টাল ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স: নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মানো কিছু শিশুর ক্ষুদ্রান্ত্র পুরোপুরি পরিণত না হওয়ায় সাময়িকভাবে ল্যাকটেজের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্যা মিটে যায়।

কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?
সাধারণত দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। পেট ফাঁপা, পেটে ব্যথা বা মোচড়, অতিরিক্ত গ্যাস, পাতলা পায়খানা, বমি বমি ভাব, কখনও বমি এবং পেটের মধ্যে গুড়গুড় শব্দ হতে পারে। কতটা ল্যাকটোজ খাওয়া হয়েছে এবং শরীরে কতটা ল্যাকটেজ তৈরি হচ্ছে, তার উপর উপসর্গের তীব্রতা নির্ভর করে।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ, খাদ্যাভ্যাস এবং কোন খাবার খাওয়ার পর সমস্যা হচ্ছে, তা জানতে চান। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ল্যাকটোজযুক্ত খাবার বন্ধ রেখে পরে তা আবার খাদ্যতালিকায় যুক্ত করে উপসর্গের পরিবর্তন দেখা হতে পারে। এ ছাড়া হাইড্রোজেন ব্রেথ টেস্টের সাহায্যেও ল্যাকটোজ হজমের সমস্যা শনাক্ত করা যায়।
তবে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আর দুধের অ্যালার্জি এক নয়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে সমস্যা হয় দুধের শর্করা হজম করতে না পারার কারণে। অন্যদিকে, দুধের অ্যালার্জি হল দুধের নির্দিষ্ট প্রোটিনের বিরুদ্ধে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া। তাই দু’টির চিকিৎসাও ভিন্ন।

দুধ খাওয়া কি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে?
সমস্যার প্রকৃত কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কতটা ল্যাকটোজ সহ্য করতে পারেন, তা বুঝে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন করা জরুরি। অকারণে সব ধরনের দুগ্ধজাত খাবার বন্ধ করে দিলে শরীরে ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত বিকল্প খাবার বেছে নেওয়া উচিত।
দীর্ঘদিন ডায়েরিয়া চললে, অকারণে ওজন কমলে বা মলের সঙ্গে রক্ত বেরলে অবহেলা করা ঠিক নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ দুধ খাওয়ার পর পেটের সমস্যা হলেই তা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স, এমনটা নয়। এর পিছনে অন্য কোনও অন্ত্রের অসুখও থাকতে পারে। সঠিক কারণ চিহ্নিত করতে পারলেই অপ্রয়োজনে খাবার বাদ না দিয়ে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
