আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় করে নিজেরাই নিজেদের অপূরণীয় ক্ষতি করছেন।
কথাটি শুনতে কিছুটা অদ্ভুত মনে হলেও বাস্তবতা হলো, ধূমপান, মাদকাসক্তি, জুয়া এবং এ রকম আরও নানা ধরনের ক্ষতিকর অভ্যাসের সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবন বিশ্লেষণ করলে এর সত্যতা উপলব্ধি করা যায়। তারা নিজেদের অর্থ ব্যয় করছেন ঠিকই, কিন্তু সেই ব্যয়ের বিনিময়ে এমন কিছু অর্জন করছেন, যা তাদের জীবনকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে থাকে।
মানুষ অর্থ উপার্জন করে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয়, এসবই অর্থ উপার্জনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। অর্থ মানুষের জীবনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে পারে, যদি তা প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা হয়। অথচ সেই অর্থই যখন এমন কিছু অভ্যাসের পেছনে ব্যয় করা হয়, যা মানুষের স্বাস্থ্য, আর্থিক সামর্থ্য কিংবা পারিবারিক শান্তি নষ্ট করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, মানুষ কি নিজের অর্থের যথাযথ ব্যবহার করছে? নাকি নিজের টাকায় নিজের ক্ষতি করছে?
আলোচনার সুবিধার্থে ধরা যাক, একজন মানুষ প্রতিদিন সিগারেট কেনার জন্য অর্থ ব্যয় করেন। এক দিনে ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ হয়তো তার কাছে খুব বেশি মনে হয় না। কিন্তু প্রতিদিনের এই ব্যয় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলতে থাকলে মোট অঙ্কটি আর ছোট থাকে না। এই অর্থ দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো, সন্তানের পড়ালেখার খরচ যোগানো, জরুরি চিকিৎসার জন্য সঞ্চয় করা কিংবা ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তোলা সম্ভব হতো। অথচ অর্থটি ব্যয় হচ্ছে এমন একটি অভ্যাস বজায় রাখতে, যা ধীরে ধীরে তার অসুস্থতা, কর্মক্ষমতা হ্রাস কিংবা অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে থাকে। এ পরিস্থিতিতে সেই ব্যয়ের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বর্তমানে সরকারিভাবেই ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। সিগারেটের প্যাকেটেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়ে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে যে, ধূমপান ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। তা সত্ত্বেও অনেক মানুষ ধূমপান অব্যাহত রাখেন। প্রশ্ন হলো, তারা কি এসব ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন না? নাকি জেনেও শুধু নেশার বশেই সব ঝুঁকিকে উপেক্ষা করেন?
ধূমপানের ক্ষতি শুধু ধূমপায়ীর নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার আশপাশের মানুষও পরোক্ষ ধূমপানের কারণে ক্ষতির শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের জন্য এই ঝুঁকি আরো গুরুতর। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি নিজের অর্থ ব্যয় করে ধূমপান করলেও তার ধোঁয়ার ক্ষতি বহন করতে হয় অন্যদের! এখানেই ব্যক্তিগত পছন্দ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি সামনে আসে। নিজের জীবন ও অর্থ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রত্যেক মানুষের রয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব যখন অন্য মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর পড়ে, তখন বিষয়টি আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না!
মানুষ যেভাবে নিজের টাকায় নিজের ক্ষতি করে তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো জুয়া। জুয়ার প্রতি আকর্ষণের পেছনে দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশা, ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন কিংবা হারানো অর্থ পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা কাজ করতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন, অল্প কিছু টাকা দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ জেতা সম্ভব। এই আশাই তাদের বারবার অর্থ ব্যয় করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু জুয়ার ফল অনিশ্চিত। জুয়ায় কেউ সাময়িকভাবে অর্থ জিতলেও তাতে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক লাভের নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। বরং বারবার খেলার ফলে অর্থ হারানো, সঞ্চয় নিঃশেষ হওয়া এবং ঋণগ্রস্ততার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে অনলাইন জুয়ার সহজলভ্যতা অনেককে অল্প সময়ে বারবার অর্থ ব্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জুয়ার একটি বিপজ্জনক দিক হলো, অর্থ হারানোর পর অনেকেই সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় আবার খেলতে থাকেন। তারা ভাবেন, পরেরবার জিতলে আগের ক্ষতি পূরণ হয়ে যাবে। কিন্তু এই প্রবণতা তাদের আরও বেশি অর্থ হারানোর দিকে ঠেলে দিতে পারে। একপর্যায়ে কেউ কেউ পরিবারের প্রয়োজনীয় অর্থ, সঞ্চয় কিংবা ধার করা অর্থও জুয়ায় ব্যয় করতে শুরু করেন।
ধূমপান, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার কিংবা জুয়ার মতো অভ্যাসের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলোর পরিণতি অনেক সময় ব্যক্তিগত গণ্ডি অতিক্রম করে পরিবারের ওপরও পড়ে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যদি নিজের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ এসব অভ্যাসের পেছনে ব্যয় করেন, তাহলে পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় সংকুচিত হতে পারে। এর পাশাপাশি রয়েছে মানসিক ক্ষতি। পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভোগেন। অন্যদিকে ধূমপানের ধোঁয়া আশপাশের মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দায়িত্বহীন আচরণ অন্যদের নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করতে পারে। সুতরাং নিজের অর্থ ব্যয়ের স্বাধীনতা থাকলেও সেই ব্যয়ের ফলাফল থেকে অন্য মানুষকে সব সময় পৃথক রাখা যায় না। এ দিকটিও গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করতে হবে।
আমাদের বুঝতে হবে, মানুষ একা বাস করেন না। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। তাই ব্যক্তির কোনো অভ্যাসের ক্ষতি যখন পরিবারের সদস্য কিংবা অন্য মানুষের ওপর বর্তায়, তখন সেই অভ্যাসের সামাজিক দায়ও বিবেচনায় নিতে হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, ক্ষতি সম্পর্কে এত আলোচনা, প্রচার ও সতর্কবার্তা থাকার পরও মানুষ কেন এসব অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না?
এর উত্তর সব ক্ষেত্রে এক নয়। কেউ আসক্তির কারণে, কেউ সামাজিক পরিবেশের প্রভাবে, কেউ মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে, আবার কেউ দ্রুত অর্থ উপার্জন বা ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এসব অভ্যাসে জড়িয়ে পড়তে পারেন। প্রাজ্ঞ পাঠকরা জানেন, এসব অভ্যাস যত গভীর হয়, তা থেকে বেরিয়ে আসাও তত কঠিন হতে পারে। তাই ধূমপান না করার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা অনেক জরুরি। ধূমপান ত্যাগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রমাণভিত্তিক সহায়তাও কার্যকর হতে পারে। মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। জুয়ার প্রতি নিয়ন্ত্রণহীন আকর্ষণের ক্ষেত্রে অর্থের প্রবাহ সীমিত করা, জুয়ার সুযোগ থেকে দূরে থাকা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তা গ্রহণ করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও তৎপরতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সহানুভূতিশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কেবল ভর্ৎসনা বা অপমান করে কাউকে পরিবর্তনের পথে আনা সব সময় সম্ভব নয়। বরং সমস্যাটি স্বীকার করতে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজনীয় সহায়তা গ্রহণে পাশে থাকা এবং ক্ষতিকর অভ্যাসের আর্থিক ও পারিবারিক পরিণতি সম্পর্কে বাস্তবসম্মত আলোচনা করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
এ নিবন্ধ শেষ করার আগে আমরা নিজেদের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন রাখতে পারি এভাবে যে, আমি কি আমার উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজের জীবনকে সমৃদ্ধ করছি, নাকি সেই অর্থ ব্যয় করে নিজের ক্ষতিকে ত্বরান্বিত করছি? প্রশ্নটি শুধু ধূমপায়ী, মাদকাসক্ত কিংবা জুয়ার প্রতি আসক্ত ব্যক্তিদের জন্য নয়; আমাদের প্রত্যেকের জন্যই প্রাসঙ্গিক। কারণ অর্থের প্রকৃত মূল্য শুধু তা উপার্জনের মধ্যে নয়, বরং সেই অর্থ দিয়ে নিজের ও অন্যের জীবনে কতটা কল্যাণ বয়ে আনা যায়, তার মধ্যেও নিহিত। তাই নিজের অর্থকে নিজের ক্ষতির কারণ না বানিয়ে সুস্থতা, নিরাপত্তা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ গঠনের উপকরণে পরিণত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সাবেক অধ্যক্ষ।
The post মানুষ যেভাবে নিজের টাকায় নিজের ক্ষতি করে appeared first on Dhaka Protidin.
